২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মালয়েশীয় বিমানে হামলা : গাজার গণহত্যা থেকে দৃষ্টি ফেরানোর অপকৌশল
১৯ জুলাই ২০১৪, শনিবার,
একটি মালয়েশীয় যাত্রীবাহী বিমানকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গুলি করে ভূপাতিত করা এবং ১৫ জন ক্রুসহ ২৯৮ জন যাত্রীকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করার ঘটনায় রুশ মার্কিন ঠা-া লড়াই আবার জোরদার হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মালয়েশীয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান ১৫ জন ক্রুসহ ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে নেদারল্যান্ডস এর আমস্টারডামের স্কিফল বিমানবন্দর থেকে রওয়ানা হয়। বিমানটির গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর। বিমানটি যখন ইউক্রেনের আকাশ দিয়ে উড়ছিল তখন একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সেটি বিধ্বস্ত হয় এবং রাশিয়া থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ডনেৎস্ক এলাকার প্রাবোভা নামক একটি গ্রামে ভূপাতিত হয়। ফলে ১৫ জন ক্রুসহ ২৯৫ জন আরোহীর সকলেই বীভৎসভাবে প্রজ্বলিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই নির্মম হত্যাকা-ের সাথে সাথেই সারা বিশ্বে একটি প্রশ্ন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সেটি হলো, কে বা কারা এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পিছনে জড়িত রয়েছে? এই হামলার পিছনে মতলবটাই বা কি ছিল? এ হত্যাকা-ের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া বা “ফল আউট” কী  হতে পারে?
মার্চ মাসের প্রথম বিমান দুর্ঘটনা
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিগত সাড়ে ৪ মাসের মধ্যে এটিই ছিল মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বিমান দুর্ঘটনা। চলতি বছরের মার্চ মাসে মালয়েশিয়ার আরেকটি যাত্রীবাহী বিমান ভারত মহাসাগরে নিমজ্জিত হয়। বিমানটি কুয়ালালামপুর থেকে চীনের রাজধানী বেইজিং যাচ্ছিল। বিমানটি নিমজ্জিত হওয়ার ফলে বিমানের ক্রুসহ ২৩৯ জন যাত্রীর সলিল সমাধি হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন এজেন্সি এবং এক্সপার্টরা ব্যাপক অনুসন্ধান করেন। কিন্তু ঐ বিমান অথবা তার একজন যাত্রীরও কোন চিহ্ন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এটি অত্যন্ত রহস্যজনক যে, ২৩৯ জন যাত্রীর মধ্যে একজনের লাশও অকুস্থলের আশেপাশে বা দূরে কোথাও ভেসে ওঠেনি। মনে হয় যেন সমগ্র উড়োজাহাজটি এবং তার যাত্রীদেরকে পাউডার বানিয়ে সমুদ্র বক্ষে ছিঁটিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রযুক্তির নিত্য নতুন অগ্রগতির ফলে ঐ বিমানটিতে কিভাবে কি ঘটেছে তা রহস্যাবৃতই রয়ে গেল।
কোন দুর্ঘটনা নয় স্পষ্ট হত্যাকান্ড
যিনিই যেভাবে ব্যাখ্যা করুক না কেন, এখন এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুঠে উঠেছে যে, ইউক্রেনের আকাশে এই বিমানের ভূপাতন এবং ২৯৮ ব্যক্তির মৃত্যু কোন অবস্থাতেই কোন দুর্ঘটনা নয়। এ ব্যাপারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দ্বার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, “আমাদের কাছে এই মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য নাই। কিন্তু আমি বলছি, দৃশ্যত এটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে। আমি আবার বলছি, এটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে এটি কোন অবস্থাতেই দুর্ঘটনা নয়। এটিকে আকাশেই উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যদি ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রুশ অস্ত্র দিয়ে অথবা রুশ জনবল দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকে তাহলে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মস্কোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রচ- চাপের মুখে পড়বে।” যদিও রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই হামলার দায়িত্ব অস্বীকার করছে কিন্তু কঠোর বাস্তব হল এই যে, এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বাক (ইঁপশ) মিসাইল সিস্টেমে উৎক্ষেপন করা যায়। বাক মিসাইল সিস্টেমের ক্ষেপণাস্ত্র উর্ধ্বাকাশে ৭২ হাজার ফুট পর্যন্ত চলন্ত বিমানকে আঘাত হানতে সক্ষম। এই ধরনের মিসাইল সিস্টেম অনেক আগেই ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাশিয়ার নিকট থেকে পেয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন সরকার এই হামলার দায়িত্ব অস্বীকার  করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, এত ঊর্ধ্বাকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানগুলি করে নামানোর সক্ষমতা নাই। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অফিসার জোরের সাথে দাবি করেছেন যে, রুশ গোয়েন্দা বাহিনীর ২ জন অফিসার বিমানটির ভূপাতনের সাথে জড়িত। এছাড়া ইউক্রেন ২টি ফোনালাপ প্রকাশ করেছে যেখানে দেখা যায় যে, একজন রুশ অফিসার বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের সাথে মিসাইল হামলার মাধ্যমে বিমান কিভাবে ভূপাতিত করা যায় সে বিষয়ে কথা বলছেন। আরোও উল্লেখ করা যেতে পারে যে ৩৩ হাজার ফুট উপরে কোন বিমানকে গুলি করতে হলে ঐ ধরনের মিসাইল সিস্টেম ছাড়া সেটি করা সম্ভব নয়।
এটি একটা অবাক ব্যাপার যে, রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে রয়েছে সেই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র যেটি রাডার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাদের কাছে জঙ্গিবিমানও রয়েছে। এসবই তাদেরকে সরবরাহ করেছে রাশিয়া।
আঞ্চলিক থেকে আন্তর্জাতিক
ফরিদ জাকারিয়া বলেছেন যে, ইউক্রেনের একটি আঞ্চলিক সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ইউক্রেন সরকারকে নেপথ্য থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু এই বিমানকে গুলি করার পর তাদের সমর্থন প্রকাশ্য রূপ ধারণ করল। ইতোমধ্যেই আমেরিকার তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তার বিমানটির ট্র্যাজেকটরি বা গতিপথ পরীক্ষা করবে এবং দেখবে যে, কোথায় কারা এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।
জন ম্যাককেইনের কঠোর অবস্থান
দেখা যাচ্ছে যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের জন্য আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং রিপাবলিকান পার্টি অনেক কাছাকাছি এসেছে। ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী এ্যারিজোনার সিনেটর জন ম্যাককেইন বলেন, “এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হবে ব্যাপক এবং গভীর। আমেরিকার উচিত, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সজ্জিত করা, যেটি আমরা নির্লজ্জভাবে করিনি। আমাদের উচিত, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত অবরোধের পরিমাণ নাটকীয় ভাবে বৃদ্ধি করা। আমাদের আরও উচিত, প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং তার রাশিয়াকে একটি একঘরে (চধৎরধয হধঃরড়হ) জাতি হিসাবে চিহ্নিত করা কারণ এটি তাদের প্রাপ্য।”
ফরিদ জাকারিয়ার আশঙ্কা
আন্তজার্তিক খ্যাতি সম্পন্ন ইংরেজি সাপ্তাহিক “নিউজ উইক” এর প্রাক্তন সম্পাদক ফরিদ জাকারিয়া বলেন, এই ঘটনার একটি মানবিক দিক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সাথে সাথে এর রয়েছে সামরিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য। এটি নির্ণীত হবে, কে এই ক্ষেপনাস্ত্রটি নিক্ষেপ করেছে, এবং কেন করেছে সেটি চিহ্নিত হওয়ার পর। এটি যদি রুশ-ইউক্রেন সংঘর্ষের পরিণতি হয় তাহলে এর প্রতিক্রিয়া হবে আরো ভয়াবহ। একটি বিষয় পরিষ্কার যে, রুশ সরকার ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীগণকে অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত করছে। কিভাবে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক এবং নাশকতামূলক কাজ করা যায় সে ব্যাপারেও তারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এদের এসব কাজ শুধুমাত্র ইউক্রেনের স্থিতিশীলতাই নষ্ট করছে না, ইউরোপের স্থিতিশীলতাও বিনষ্ট করছে।
জন ম্যাককেইন অন্যত্র বলেছেন, এই ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ইউক্রেন সমস্যায় আরো বেশি করে জড়িয়ে পড়বে এবং বিশ্ব জনমতও এতে পরিবর্তিত হবে। ফলে পরিস্থিতি আরো উত্তেজনাকর এবং আরো ভয়াবহ হবে।
রণাঙ্গনের আংশিক স্থানান্তর
নব্বই দশকের প্রথম ভাগে সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলে আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হয়। তখন থেকে বিশ্ব পরিচিত হয় এককেন্দ্রিক বিশ্ব হিসেবে। এরপর থেকেই আমেরিকার নজর মোটামুটি সম্পূর্ণভাবে এশিয়ার উপর নিবদ্ধ হয়। এশিয়ার উপর নিবদ্ধ হলেও তার ফোকাস পড়ে প্রধানত মুসলিম জাহানের ওপর। ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালিয়ে আমেরিকা এই ২টি দেশকে পদানত করে। পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করে এবং অসংখ্য ড্রোন হামলা চালায়। আমেরিকার হঠকারিতার কারণেই পাকিস্তানের জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। ইরানকেও তারা পদানত করতে চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
একসময় ইউরোপে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো এবং সোভিয়েট নেতৃত্বাধীন ওয়ারস সামরিক জোট মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। সোভিয়েট ইউনিয়নে পতনের ওয়ারস জোট বিলুপ্ত হয়। কিন্তু রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলের পর আমেরিকা পুনরায় ইউরোপে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। বহুদিন পর সাদা চামড়া বনাম সাদা চামড়ার ¯œায়ু যুদ্ধ দেখা যাচ্ছে। পর্যবেক্ষক বহাল এই ¯œায়ুযুদ্ধের ভবিষৎ দেখার জন্য ফিঙ্গার ক্রস করে আছেন।
মনযোগ ফেরানোর অপপ্রয়াস?
গাজায় ৩ জন ইহুদি শিশু অপহরণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে ইসরাইল মাত্র ১৮ লক্ষ অধিবাসী অধ্যুষিত গাজা উপত্যাকায় হামলা চালাচ্ছে। ১০ দিনের হামলায় ২৩৭ জন আদম সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। ১ লক্ষ গাজাবাসীকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। আমেরিকা বহু পাপ করেছে। ইরাকে এ পর্যন্ত ১০ লক্ষ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। আফগানিস্তানে ২ লক্ষ বেসমারিক নাগরিককে খুন করা হয়েছে। হামাস ইহুদি কিশোরকে খুন করেনি। তারপরেও সেটিকে অজুহাত বানিয়ে আমেরিকার মদদপুষ্ট হয়ে ইসরাইল গাজায় মুসলমানদের রক্তে হোলি খেলা শুরু করেছে। সমগ্র বিশ্ব বিবেক জেগে উঠেছে। ইসরাইল আজ হানাদার হিসেবে চরমভাবে ধিকৃত ও নিন্দিত। ইসরাইলের এই বর্বরতা এবং তার ওপর বিশ্ববাসীর এই ঘৃণা ও ধিক্কার থেকে মানুষের দৃষ্টি ফেরানোর কৌশল হিসেবে মালয়েশিয়ার এই বিমানে হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। তবে কে বা কারা করেছে এবং কি উদ্দেশ্য করেছে তা জানতে আরোও কিছুদিন সময় লাগবে বলে তারা মনে করেন।
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/2014/07/19/193168.php#sthash.oNrIkFc0.dpuf