২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে ১৯ তম সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা শেষ ২০ তম সাক্ষী আজ
৯ জুলাই ২০১৪, বুধবার,
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৯ তম সাক্ষী নিজামউদ্দিন খানকে গতকাল মঙ্গলবার জেরা শেষ করেছেন ডিফেন্স আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই জেরা রেকর্ড করেন। গতকাল ডিফেন্স পক্ষে ট্রাইব্যুনালে আরো উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট এস. এম শাহজাহান কবির, এডভোকেট আসাদুল ইসলাম ও  এডভোকেট আবদুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ।
জবানবন্দীর উল্লেখযোগ্য অংশ
আমার নাম নিজামউদ্দিন খান, পিতা-জান মামুদ খান (মৃত), ঠিকানা- গ্রামঃ চরতারাপুর টাটিপাড়া, থানা ও জেলাঃ পাবনা। আমার বর্তমান বয়স ৬০/৬১ বছর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৭/১৮ বছর।
১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পার্শ্ববর্তী দুবলিয়া বাজারে সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে রাজাকারদের একটি ক্যাম্প ছিল। ঐ [রাজাকার ক্যাম্পে অভিযুক্ত সুবহান মাওলানা প্রায়ই আসা-যাওয়া করতো।] দুবলিয়া হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম ছিল এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজাকাররা হিন্দু পরিবারের বাড়ি-ঘরের মলামাল লুটতরাজ ও অত্যাচার করতো। ১৯৭১ সালে আমার চাচা কলিমুদ্দিন খান একজন অবসর প্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্দের সময় রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার থেকে হিন্দু পরিবারের সদস্যদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে যে কোন দিন বেলা ২টা আড়াইটার দিকে দুবলিয়া বাজারে এসে গোবিন্দ এর চায়ের দোকানে বসে চা পান্ করছিলেন। ঐ সময় আমিসহ আমাদের পরিবারের অনেকেই দুবলিয়া বাজারে বাজার করছিলাম। ঐ সময় সাদা একটি জীপ গাড়ি দুবলিয়া বাজারে রাজাকার ক্যাম্পে আসতে দেখি। গাড়িটি রাজাকার ক্যাম্পের সামনে আসার সংগে সংগে ঐ ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পের কমান্ডার সামাদের নেতৃত্বে সশস্ত্র অবস্থায় পলু, কাদের, মমতাজ এবং মাওলানা সুবহানসহ রাজাকারদের বেশ কিছু সদস্য গোবিন্দ এর চায়ের দোকানে গিয়ে আমার চাচা কলিমউদ্দিনকে ধরে নিয়ে রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে আসে। এ সময় আমি এবং আমার গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যরা আত্মগোপনে গিয়ে কিছু নিরীহ লোককে রাজাকার ক্যাম্পে পাঠাই আমার চাচার কি অবস্থা এটা দেখার জন্য। তারা ফিরে এসে আমাদেরকে জানায় আমার চাচাকে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা মারধর করছে।
সন্ধ্যার দিকে আমরা দেখতে পেলাম আমার  চাচা কলিমউদ্দিন ও তার সংগীয় আর একজনকে সাদা জীপে করে মাওলানা সুবহানসহ রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা রাজাকার ক্যাম্প থেকে পাবনা শহরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পরদিন সকালে আমার চাচা কলিমউদ্দিনের আপন ভাই নইমুদ্দিন খান যিনি আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীকোল গ্রামে বসবাস করতেন তার সাথে দেখা করার জন্য আমি এবং আমার গোষ্ঠীর কিছু লোক যাই।
আমার নইমুদ্দিন চাচা তখন হোসেন সরকার ও আমাকেসহ ১০-১৫ জনকে নিয়ে কলিমুদ্দিন চাচার সন্ধানের জন্য কুচিয়ামোড়ার দিকে রওনা হয়। সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টা ১০টার দিকে কুলিয়ামোড়া কালিমন্দিরের কাছাকাছি ঝোপের কাছে পৌঁছালে একটি গাড়ির শব্দ শুনতে পাই। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটা কালিমন্দিরের সামনে পৌঁছালে ঐ গাড়ি থেকে সুবহান মাওলানা নামে এবং আমার চাচা কলিমুদ্দিনকে ঐ গাড়ি থেকে নামনো হয় এবং আমার চাচাকে সশস্ত্র রাজাকাররা কালিমন্দিরের ভিতরে নিয়ে যায়। গাড়িটি কালী মন্দিরের সামনে পৌঁছানোর সংগে সংগে আমরা ঝোপের আড়ালে আত্মগোপণ করি। আমার চাচাকে কালীমন্দিরের ভিতরে নিয়ে যাওয়ার পর পরই ৫-৭টি গুলীর আওয়াজ শুনতে পাই। এর কিছুক্ষণ পর সুবহান মাওলানা এবং রাজাকার বাহিনীর কিছু সদস্যকে গাড়িতে উঠে পাবনার দিকে চলে যেতে দেখি। গাড়িটি পাবনার দিকে চলে যাওয়ার পর আমরা ঝোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ১০-১৫জন কালীমন্দিরে প্রবেশ করি এবং সেখানে আমার চাচাকে গুলীবিদ্ধ ও রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত পড়ে থাকতে দেখি। তখন আমার চাচার লাশ নিয়ে শ্রীকোল গ্রামে চলে আসি এবং তার দাফন-কাফন সম্পন্ন করে আমি আমার বাড়িতে চলে আসি। মাওলানা সুবহানকে আমি চিনতাম।
 
 
প্রশ্ন: আপনাকে তদন্তকারী কর্মকর্তা কবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন  ?
উত্তর :  গত বছর দুবলিয়া বাজারে সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। এর পরও একই স্থানে আমাকে আরেক বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। আমাদের গ্রামের আরশাদ খাঁ আমাকে তদন্তকারী কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করবে মর্মে খবর দিয়েছিল। আরশাদ খাঁ একজন কৃষক, তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। দ্বিতীয়বার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট যাবার জন্য কে খবর দিয়েছিল মনে নেই।
প্রশ্ন: আপনি কি মাওলানা সুবহানের বাড়িতে গিয়েছেন ?
উত্তর : আমি কখনও মাওলানা সুবহান সাহেবের বাড়িতে যাইনি, আমার বাড়িতে মাওলানা সুবহান কখনও আসেননি। আমি ১৯৭১ সালের পূর্ব থেকেই আওয়ামী লীগ করি।
প্রশ্ন: সংসদ নির্বাচন কবে হয়েছিল ?
উত্তর: ১৯৭১ সালের পূর্বে সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, এটা আমার স্মরণ আছে। আমি উক্ত নির্বাচনের প্রচারণাকালে দুবলিয়া বাজারে আওয়ামী লীগের একটি জনসভায় গিয়েছিলাম যেখানে এ্যাডভোকেট আমজাদ সাহেব আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিলেন, ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্য কোন প্রার্থী ছিলেন কিনা আমার জানা নাই। আমি মাওলানা ইসহাকের নাম শুনেছি কিনা স্মরণ নেই।
জেরার জবাবে সাক্ষী আরো বলেন, উক্ত নির্বাচনে সাদুল্লাপুর ইউনিয়নে জামায়াতের নেতা কে ছিল তা খেয়াল নেই। আজগর হোসেন জায়েদীর নাম শুনেছি কিনা তা স্মরণ নেই। ৭১ সালে মোফাজ্জল আলী নামে কোন ব্যক্তির নাম শুনেছি কিনা স্মরণ নেই। ৭১ সালে আমি পিস কমিটির নাম শুনেছি। আমাদের ইউনিয়নের পিস কমিটির চেয়ারম্যান কে ছিল বলতে পারবো না। ৭১ সালে আমাদের ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন মজিদ মাস্টার। ৭১ সালে আমাদের ইউনিয়নে তারাবাড়িয়া নামক স্থানে একটি ছোট হাট বসতো। এই হাটটি উত্তর পূর্ব কোনে ৩ কি. মি. দূরে। ইহা সত্য নয় যে, টাটিপাড়া একটি চর এলাকা। দুবলিয়া বাজারে অবস্থিত রাজাকার ক্যাম্পটি ৪ কক্ষ বিশিষ্ট একতলা বিল্ডিং ছিল। আমার বর্ণিত রাজাকার কমান্ডার সামাদের বাড়ি দুবলিয়া গ্রামে। তাকে আমি ৭১ সালের পূর্ব থেকে চিনতাম, তবে তার পেশা কি ছিল তা বলতে পারবো না। সে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন কিনা তা জানি না।
প্রশ্ন : দুবলিয়া বাজারে রাজাকার ক্যাম্পটি কোন মাসে স্থাপিত হয়েছিল?
উত্তর:  এটা আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবো না। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের এলাকায় আসার সাথে সাথেই রাজাকার ক্যাম্পটি স্থাপিত হয়েছিল।
প্রশ্ন: বাজারটি আপনাদের বাড়ি থেকে কোন দিকে ?
উত্তর: আমাদের বাড়ি থেকে দুবলিয়া বাজারটি উত্তর দিকে ১ কি.মি. দূরে। শাখারী পাড়া গ্রামের নাম আমি শুনেছি। ইহা সত্য যে, আমাদের গ্রাম থেকে ৪/৫টি গ্রাম পর শাখারী পাড়া গ্রামটি অবস্থিত। ইহা সত্য নয় যে, শাখারী পাড়া থেকে নন্দনপুর গ্রামটি উত্তর দিকে অবস্থিত। ইহা সত্য নয় যে, শাখারী পাড়া এবং কুচিয়ামোড়া গ্রামের মধ্যে একটি গ্রাম আছে। গ্রাম দুটি পাশাপাশি অবস্থিত।
সাক্ষী আরো বলেন, ইহা আমার স্মরণ আছে যে, ৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন এলাকায় পাকিস্তান সৈন্যরা কবে এসেছিল তা আমার স্মরণ নেই। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কখনও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হইনি, তবে দূর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীদের দেখেছি। ইহা সত্য যে, ২৬ মার্চ ৭১ এর ১৫-২০ দিন পর পাকিস্তান সৈন্যদের সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের রাস্তা দিয়ে দূর থেকে চলাচল করতে দেখেছি। ইহা সত্য নয় যে, পাকিস্তান সৈন্যরা সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন এলাকায় আসার সাথে সাথে তারা সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের শাখারী পাড়া সহ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও অত্যাচার চালিয়েছিল। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ রাজাকাররা চালিয়েছিল। এটা আমার জানা নেই যে, সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ছিল কিনা। শাখারী পাড়া ও কুচিয়ামোড়া বর্তমানে আতাইকুলা ইউনিয়নের আওতাধীন। ইহা সত্য নয় যে, কুচিয়ামোড়াতে ৭১ সালে কোন মন্দির ছিল না।
আমার দাদার নাম নসির খান। শহীদ কলিমুদ্দিন এর পিতার নাম আমার স্মরণ নেই। ১৯৭৩ সালে আমার বিয়ে হয়েছিল। ইংরেজী মাস কি ছিল তা মনে নেই, তবে বাংলা সনের আশ্বিন মাস ছিল।
জবানবন্দীতে আমি যে নিরীহ লোকদের রাজাকার ক্যাম্পে পাঠিয়েছিলাম, তাদের কারো নাম এই মুহূর্তে স্মরণ নেই। ইহা সত্য যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাদুল্লাপুর এলাকায় আসার পরপরই হিন্দু জনগোষ্ঠী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি কখনই আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোন দলের জনসভায় শুনতে যাইনি। ইহা সত্য নয় যে, আমার জবানবন্দীতে বর্ণিত শেখানো মতে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=151201