২৯ মে ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে ১৮তম সাক্ষীর জেরা শেষ ১৯ তম সাক্ষী ৮ জুলাই
১ জুলাই ২০১৪, মঙ্গলবার,
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৮তম সাক্ষী আবদুল আজিজের জবানবন্দী ও জেরা গতকাল সোমবার শেষ করেছেন ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী। আগামী ৮ জুলাই মামলার পরবর্তী ১৯ তম সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছেন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল ডিফেন্স পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মোঃ মিজানুল ইসলাম, এস এম শাহজাহান কবির, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, আসাদুল ইসলাম। প্রসিকিউসন পক্ষে ছিলেন সুলতান মাহমুদ সিমন ও রিজিয়া সুলতানা।
গতকালের জবানবন্দীর উল্লেখযোগ্য অংশ
আমার নাম আবদুল আজিজ, পিতা- বিশা মল্লিক (মৃত), মাতা- খোদেজা বিবি (মৃত)। ঠিকানা- গ্রামঃ ভাড়ারা, থানা ও জেলা- পাবনা। আমার বর্তমান বয়স ৬২ বছর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৮ বছর। আমি কৃষি কাজ করি। আমি লেখাপড়া জানি না।
১৯৭১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের ৫ তারিখ ভোর আনুমানিক ৭ ঘটিকায় মোটারযানের শব্দ শুনে আমি ঘর থেকে বের হয়ে দেখি একটি সেনাবাহিনীর ও একটি সাদা গাড়ি আমাদের গ্রামের দিলবার শেখের বাড়ির পূর্ব দিকে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাদা গাড়ি থেকে মাওলানা সোবহান সাহেব এবং বন্দের চেয়ারম্যানকে নামতে দেখি। সুবহান মাওলানা ৬/৭ জন সেনা সদস্যকে নিয়ে দিলবার শেখের বাড়িতে প্রবেশ করে। ঐ বাড়িতে প্রবেশ করে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে দিয়ে দিলবার শেখকে ধরে নিয়ে আসে। দিলবার শেখ ও আমার বাড়ি পাশাপাশি। আমাকে দেখে মাওলানা সুবহান হাতের ইশারা দিয়ে ডাক দেয়। আমি সুবহান মাওলানার কাছে গেলে আমাকে ও দিলবার শেখকে আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তায় নিয়ে যায়। এরপর মাওলানা সুবহান আমাদের এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে নিয়ে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হল। এক পর্যায়ে মাওলানা সুবহানের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা আমাদের গ্রামের সিরাজ শেখকে তার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসে এবং সিরাজ শেখসহ আমাদেরকে আরো পশ্চিম দিকে হেঁটে হেঁটে অগ্রসর হয়। এরপর গেদন সরদার, কাদু শেখ, কেতা সরদার, রুস্তম, মজিদ, জব্বার শেখ, তালেব শেখ, আকবর শেখ, হারুন শেখ, মানিক খাঁ, উটকেন শেখদেরকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে সেনাবাহিনী দ্বারা ধরিয়ে এনে রাস্তার ওপর আমাদের সংগে জড়ো করা হয়। এরই এক পর্যাযে ভাড়ারা গ্রামের কালিকমোলকে পাক সেনারা তার নিজ বাড়িতে গুলী করে হত্যা করে। এরপর আমাদের সকলকেই ভাড়ারা শাহী মসজিদের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে গিয়ে আমরা ১০-১২টি সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখতে পাই। আমাদেরকে লাইন করিয়ে দাঁড় করানো হয়। তখন মাওলানা সুবহান সাহেবের হাতে একটি সাদা কাগজ দেখতে পাই। এই কাগজটির দিকে তাকিয়ে মাওলানা সুবহান দিলবারের নাম ধরে ডাকে। এভাবে যাদের নাম ডাকা হচ্ছিল তাদেরকে আলাদা করে দাঁড় করানো হয়। এভাবে ডাকাডাকির সময় মজিদ শেখকে দুইবার নাম ধরে ডাকলে সে কোন সাড়া দেয়ায় তৃতীয় বারের সময় সে সাড়া দেয়। তখন মাওলানা সুবহান এর নির্দেশে পাক সেনাসদস্যরা গুলী করে মজিদ শেখকে ওখানেই হত্যা করে। এরপর আটককৃতদের মধ্য থেকে ১৭ জনকে গাড়িতে তুলে পাবনায় নিয়ে যায়। এরপর আমরা গ্রামে ফিরে গিয়ে গ্রামের মুরুব্বি আজিম উদ্দিন ও দিলবার খাঁ, আয়েজ উদ্দিন খাঁ’দের কাছে মজিদের হত্যাকা-ের ঘটনাটি বর্ণনা করি। তারপর গ্রামবাসীরা এসে মজিদের লাশ নিয়ে ভাড়ারা গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করে।
এই ঘটনার পরদিন বিকাল ৪/৫টার দিকে সংবাদ পাই যে, আহত অবস্থায় দিলবার শেখ, আকবার শেখ গ্রামে এসেছে আর সিরাজ শেখকে পাক সেনারা বয়স্ক লোক বিবেচনায় ছেড়ে দিয়েছে এবং সেও গ্রামে এসেছে। আমি দিলবার শেখের সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করি আপনাদের ১৭/১৮ জনকে নিয়ে গেল কিন্তু আপনারা ছাড়া আর লোকজন কোথায়? উত্তরে দিলবার বলেছিল, তাদেরকে যে দিন ধরে নিয়ে যায় সেদিন তাদেরকে পাবনার নুরপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আটক রাখা হয়েছিল। পরের দিন সকাল ১০/১১টার দিকে তাদের মধ্যে ১১ জনকে দেবোত্তর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ১১ জনের মধ্যে পূর্বে উল্লেখিত (গ্রামে ফিরে আসা) সিরাজ শেখকে দেবোত্তর বাজার থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকি ১০ জনকে দেবোত্তর বাজারের নিকট বাঁশঝাড়ের কাছে নিয়ে তাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলী চালানো হয়। মাওলানা সুবহানের নির্দেশে সেনাবাহিনীর সদ্যরা এই গুলী চালিয়েছে। দিলবারের কাছে আমি আরো জানতে পারি ঐ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৬ জন নিহত হয়। দিলবার শেখ, আকবর শেখ, রুস্তম শেখ, মানিক খাঁ আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যায়। রুস্তম শেখকে তার আত্মীয়রা একদন্ত গ্রামে নিয়ে যায়। মানিক খাঁকে তার আত্মীয়রা শ্রীপুর গ্রামে নিয়ে যায়। দেবোত্তর গ্রামের লোকেরা দিলবার শেখ ও আকবার শেখকে একটি গরু গাড়িতে করে ভাড়ারায় নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। দিলবারের কাছে আরো শুনতে পাই নিহত ৬ জনকে (উটকেন শেখ, হারুন শেখ, জব্বার শেখ, তালেব শেখ, নূরু শেখ ও সিরাজ শেখ) স্থানীয় লোকেরা একটি গর্ত করে বাঁশঝাড়ের নিচে  মাটি চাপা দেয়।
এই ঘটনার ২/৩ দিন পর রুস্তম শেখ আহত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মানিক খাঁও শ্রীপুর গ্রামে ২/৩ দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। দিলবার এবং আকবার ঘটনার ৪/৫ দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। যে সিরাজ শেখকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল সে আমাকে বলেছিল গ্রাম ছেড়ে চলে যা নইলে তোদেরকেও মেরে ফেলবে। সিরাজ শেখও এই ঘটনার মাস দেড়েক পরে মৃত্যুবরণ করেন। আমি সিরাজ শেখের কথা শুনে আমার গ্রাম ছেড়ে চর এলাকায় চলে যাই। মাওলানা সুবহান সাহেবকে আমি চিনতাম। তিনি ভোট করতেন। তিনি আমাদের গ্রামের কফিল উদ্দিন ডাক্তারের বাড়িতে ভোটের কাজের জন্য আসতেন। অভিযুক্ত মাওলানা সুবহান ডকে সনাক্ত। তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে এক বছর আগে জিজ্ঞাবাসাদ করেছে।
জেরার উল্লেখযোগ্য অংশ
প্রশ্ন : আপনি কখন দেবোত্তর গ্রামে গিয়েছিলেন?
উত্তর : স্বাধীনের পর আমি দেবোত্তর গ্রামে গিয়েছি।
প্রশ্ন : আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
উত্তর : আমার বর্ণিত রুস্তম শেখকে যে আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো সে বাড়িতে আমি যাইনি। ইহা আমি জানি না যে, দেবোত্তর গ্রামের পাশ দিয়ে একটি মহাসড়ক গিয়েছে। দেবোত্তর বাজার থেকে দেবোত্তর গ্রামটি কোন দিকে তা আমি সঠিকভাবে বলতে পারবো না।
প্রশ্ন : দেবোত্তর গ্রামটি কত দূর?
উত্তর : দেবোত্তর গ্রাম আমার বাড়ি থেকে আনুমানিক ২০ মাইল দূরে।
প্রশ্ন : আপনি কি বাঁশঝাড়ে গিয়েছিলেন?
উত্তর : আমার বর্ণিত মতে দেবোত্তর বাঁশঝাড়ে আটককৃতদের মধ্যে যে, ৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল সেই বাঁশঝাড়ে আমি যাইনি।
প্রশ্ন : ভাড়ারা গ্রামের অবস্থান বলতে পারবেন কি?
উত্তর : ভাড়ারা গ্রামের উত্তর দিকে চর পীরপুর গ্রাম, দক্ষিণ দিকে আওরঙ্গবাদ, পশ্চিমে দোগাছি, পূর্ব দিকে দুবলিয়া-হরিতলা। শ্রীপুর  গ্রামটি ভাড়ারা গ্রাম থেকে দক্ষিণে আনুমানিক ৩ মাইল দূরে। শ্রীপুর ও ভাড়ারা গ্রামের মাঝখানের নাম বলতে পারবো না। ইহা সত্য নয় যে, আমি বর্তমানে যে বাড়িতে বসবাস করি তা স্বাধীনতার ১০-১৫ বছর পর নির্মাণ করা হয়েছে। আমি বর্তমানে যে বাড়িতে বসবাস করি সেটা পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছি। আমরা তিন ভাই বোন। আমি সবার বড়। ’৭১ সালে আমি কৃষিকাজ করতাম। ১৯৭১ সালে আমি অন্যের জমিতে মজুর হিসেবে কাজ করতাম, এখনও মজুর হিসেবেই কাজ করি। আমার ছোট বোন বেঁচে আছে, সে সাদুল্লাপুর স্বামীর বাড়িতে থাকে। ভাড়ারা আব্দুস সুবহান বিশ্বাসকে আমি চিনি।
জেরার জবাবে সাক্ষী বলেন, আমাদের বাড়ি থেকে শাহী মসজিদ যাওয়ার পথে কালিকোমলের বাড়ি পড়ে। ইহা সত্য নয় যে, ১৯৭১ সালের ৫ জৈষ্ঠের পর আমাদের এলাকায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা আসেনি। এই ঘটনার এক-দেড় মাস পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের এলাকায় আবারো এসে হিন্দুপাড়া পুড়িয়ে দেয়। হিন্দুপাড়াটি শাহী মসজিদের পূর্ব পাশে। আমার বাড়ি থেকে হিন্দুপাড়াটি ২০-৩০ কাঠা জমির পর। ১৯৭১ সালে হিন্দু পাড়ায় আনুমানিক ৫০-৬০টি বাড়ি ছিল। পূর্ব জামুয়া আমার বাড়ি থেকে দক্ষিণে। ১৯৭১ সালের ৫ জৈষ্ঠ শাহী মসজিদের নিকটে আলী রানা শেখের (পিডব্লিউ-১৭) সাথে দেখা হয়েছিল। আলী রানা শেখের বাড়িটি আমার বাড়ি থেকে ৪/৫টি বাড়ি পরে। আমি জানি না যে, আলী রানা শেখ ৭১’ সালের ৫ জৈষ্ঠ একদন্ত গ্রামে গিয়েছিল কি না। ভাড়ারা গ্রামের বন্দের আলী ম-লকে চিনতাম। ৭১ সালে বন্দের আলী ম-ল পড়ালেখা করতো। ইহা সত্য নয় যে, ৭১ সালে ৫ জৈষ্ঠের পর আলী রানা শেখের সাথে আমার দেখা হয়নি। ৭১ সালের ৬ জৈষ্ঠ আলী রানা শেখ তার পিতার আহত হওয়ার কথা শুনে একদন্ত গ্রামে গিয়েছিল কি না জানি না। কেননা তখন আমি পাক সেনাদের ভয়ে এলাকা ছেড়ে দূরে থাকতাম। ইহা সত্য যে, কফিল ডাক্তার একজন গ্রাম্য ডাক্তার ছিলেন। ভাড়ারা গ্রামে কালিকমলের বাড়ির উত্তর পাশে শ্মশানঘাট অবস্থিত। বর্তমানে শ্মশানঘাটটি পতিত অবস্থায় আছে। বর্তমানে বাংলা কি মাস চলছে বা পূর্বে বাংলা মাস কি ছিল তা বলতে পারবো না। আমার বিয়ে বাংলা কোন মাসে কোন তারিখে হয়েছিল বলতে পারবো না। ইহা সত্য নয় যে, বন্দের চেয়ারম্যানের সাথে শেখ পরিবারের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব থেকেই বিরোধ চলে আসছিল। ইহা আমি জানি যে, বন্দের আলীর ছেলে আমাদের এলাকার চেয়ারম্যান ছিল।
সাক্ষী আরো বলেন, ইহা সত্য নয় যে, ১৯৯৫ সালে আব্দুস সালামের লোকজনের সাথে ভাড়ারা গ্রামের শেখ পরিবারের এক বন্দুক যুদ্ধ হয়েছিল বা সেই বন্দুক যুদ্ধে দুইজন নিহত হয়েছিল বা আক্কাস শেখ চোখে গুলীবিদ্ধ হয়েছিল। ইহা সত্য যে, মাওলানা সুবহানের ছেলের সাথে ডা. কফিলের মেয়ের সাথে বিয়ে হয়েছিল তবে এই বিয়ে ১৯৭৯ সালে হয়েছিল কি না তা জানি না। ১৯৭০ সালের পূর্বের বা ৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা নেই। যুদ্ধের আগের বছর মাওলানা সুবহান এবং আমজাদ সাহেব ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন এইটুকু আমার খেয়াল আছে। এ ছাড়া ঐ ভোট সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। ১৯৭০ সালে সেলিনা খাতুন নামে কোন মহিলার নাম আমি শুনিনি।
ইহা সত্য নয় যে, ৭১ সালে আমি সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামে থাকতাম। ভাড়ারা থেকে সাদুল্লাপুর থাকতাম। ভাড়ারা থেকে সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন পূর্ব দিকে আনুমানিক ৮-১০ মাইল দূরে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে আলী রানা শেখের বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ইহা সত্য নয় যে, গতকালও তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ইহা সত্য নয় যে, ৭১ সালে আমার বয়স ১৮ বছর ছিল না। ইহা সত্য নয় যে, আমি ভবিষ্যৎ লাভের আশায় মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=150457