২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে ১৬ তম সাক্ষীর জেরা শেষ পরবর্তী সাক্ষী রোববার
২৬ জুন ২০১৪, বৃহস্পতিবার,
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ তম সাক্ষী আক্কাছ শেখকে গতকাল বুধবার জেরা শেষ করেছেন ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী। আগামী ২৯ জুন মামলার পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছেন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল ডিফেন্স  পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মোঃ মিজানুল ইসলাম, এস এম শাহজাহান কবির, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান, আসাদুল ইসলাম। প্রসিকিউসন পক্ষে ছিলেন সুলতান মাহমুদ সিমন ও রিজিয়া সুলতানা।
জবানবন্দির উল্লেখযোগ্য অংশ
আমার নাম-আক্কাছ শেখ, পিতার নাম-বাহের শেখ (মৃত) মাতার নাম-সরজান বিবি (মৃত), ঠিকানা-গ্রাম-ভাড়ারা, থানা-পাবনা সদর, জেলা-পাবনা। বর্তমান বয়স-৬৫ বছর। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বয়স ছিল- ২০/২১ বছর। আমি পড়াশুনা জানি না। আমি কৃষি কাজ করি।
সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের ৫ তারিখে সকাল ৮টার দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে আমাদের গ্রামটি ঘেরাও করে ফেলে। আমার ভাই উটকেন শেখকেও মাওলানা সোবহান আমাদের বাড়ি থেকে আমার সামনে ধরে নিয়ে মসজিদের সামনে নিয়ে আসে। তখন আমি ভাইয়ের পিছু পিছু মসজিদের সামনে আসি। ধৃত লোকদের মধ্যে আমার নানা খেদন শেখ, আমার মামা কাদের শেখ, রোস্তম শেখ, সিরাজ শেখ, নুরুল ইসলাম, জব্বার, তালেব শেখ, আকবর শেখ, দেলবর শেখ, অন্য এক সিরাজ শেখ, গেদন সরদার, কাদের শেখ, কেতা সরদার, হাকিম সরদার, মানিক খাঁ, মজিদ শেখ, হারুন শেখসহ অন্যান্য পাড়া প্রতিবেশীরা ছিল।
এরপর আটককৃত সকলকে হাত বেঁধে মিলিটারীর গাড়িতে তুলে পাবনার নুরপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যায়। আমি আনুমানিক ঘণ্টা ২ পরে জানতে পেরেছিলাম আটককৃতদের নুরপুর ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। সিরাজ বাড়িতে ফিরে এলে তার কাছে গিয়ে আমরা আমার ভাই, নানা, মামাদের খবর জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় তাদেরকে দেবত্তর বাঁশঝাড়ের কাছে নিয়ে মিলিটারীরা গুলী করে হত্যা করেছে এবং আমাদেরকে বললো তোমরা কেউ বাড়িতে থেকো না, না হলে মিলিটারীরা তোমাদেরকেও মেরে ফেলবে। আহতদের মধ্যে গুলীবিদ্ধ রোস্তম শেখকে তার আত্মীয়রা পার্শ্ববর্তী একদন্ত গ্রামে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সে সেখানেই মারা যায়। আহত মানিক খাঁকে তার ভগ্নীপতি হাকিম শ্রীপুর গ্রামে নিয়ে যায় এবং সেখানেই মারা যায়। আহত দেলবর শেখ ও আকবর শেখকে গরুর গাড়িতে করে নিয়ে আসে এবং সেখানেই তারা মারা যায়।
সাক্ষীর জেরার
উল্লেখযোগ্য অংশ
প্রশ্ন : বন্দের আলী কোন দল করতেন ?
উত্তর : বন্দের আলী মুসলীম লীগ করতেন।  দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই বন্দের আলীকে মুক্তিবাহিনীরা ধরে হত্যা করেছিল। বন্দের আলীকে হত্যার সঙ্গে মানিক খাঁ’র ভাই কিতাই খাঁ বা মমিন খান জড়িত ছিল কি না তা আমি জানি না।
প্রশ্ন : বন্দের আলীর ছেলের নাম কি ছিল ?
উত্তর :  বন্দের আলীর এক ছেলের নাম হচ্ছে আব্দুস সালাম। স্বাধীনতার পর সে একবার আমাদের ইউপির চেয়ারম্যান হয়েছিল।
প্রশ্ন : সিরাজের বাড়ি কোথায় ছিল ?
উত্তর : আমার বর্ণিত সিরাজের বাড়ি যাকে পাকিস্তানী সৈন্যরা ছেড়ে দিয়েছিল তার বাড়িটি আমাদের বাড়ি থেকে ১০/১২টি বাড়ি পর। তাকে মুক্তি দেয়ার মাস দেড়েক পর সে মারা যায়।
প্রশ্ন : সিরাজের কয় ছেলে ছিল ?
উত্তর : সিরাজের ২ ছেলে, এক ছেলে দেনু শেখ। সে মারা গেছে। আরেক ছেলের নাম বুলবুল সে বেঁচে আছে।
প্রশ্ন : রুস্তম শেখের কয় ছেলে ছিল ?
উত্তর : রুস্তম শেখের এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের নাম রানা, মেয়ের নাম আমার জানা নেই। ১৯৭১ সালে রোস্তম শেখের মেয়ের বয়স ছিল আনুমানিক ৫/৬ বছর।
জেরার জবাবে সাক্ষী আরও বলেন, দেবত্তর গ্রামটি আটঘরিয়া থানা এলাকার মধ্যে মনে হয়। একদন্ত গ্রামটি আমাদের গ্রাম থেকে আনুমানিক ২০ মাইল পূর্ব দূর হবে। তবে এই গ্রামটি কোন থানায় তা আমি বলতে পারবো না। নুরপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আমাদের বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে আনুমানিক ৭/৮ মাইল দূরে হবে। আমার বর্ণিত মতে পাক সেনাবাহিনীর সদস্যরা যাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে আমি ছিলাম না। তাদের কাছাকাছি ছিলাম। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটককৃতদের মধ্য থেকে আনুমানিক ১০/১২ জনকে ছেড়ে দিয়েছিল, তাদের মধ্যে আজিমদ্দিন শেখ, বন্দের ম-ল প্রমুখ।
সাক্ষী আরও বলেন, ইহা সত্য নয় যে, সিরাজ উদ্দিনকে নুরপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সিরাজ আমাদেরকে বাড়ী থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা বলার পর পরই আমরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমার বর্ণিত ৫ জ্যৈষ্ঠ ’৭১ -এর পূর্বে পাক সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের এলাকায় আসেনি। ঐ তারিখে মাস খানিক পর এলাকার মিস্ত্রি বাড়ি এবং অন্যান্য হিন্দুদের তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল। ইহা সত্য নয় যে, ঐ বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়ার আগেই হিন্দুরা তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। ইহা সত্য নয় যে, কালি কমল পালকে হত্যা করা হয়েছিল।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে কোন নির্বাচন সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। ’৭০ সালের নির্বাচনে আমি কোন ভোট দেইনি। আমি ভোটার ছিলাম না কেননা আমার নাম ভোটার লিস্টে ছিল না। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে মাওলানা সোবহান এবং আমজাদ উকিল প্রার্থী হয়েছিলেন। আমার জানা নাই যে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমজাদ উকিল প্রার্থী ছিলেন কি না। আমি আমজাদ উকিল সাহেবকে দেখেছিলাম। ৭০ সালে কয়দিনে ভোট হয়েছিল তা আমার খেয়াল নেই। ৭০ সালে মাওলানা সোবহান এবং আমজাদ উকিল সাহেব ছাড়া অন্য কোন প্রার্থী ছিল কি না তা আমার জানা নাই। আব্দুর রব বগামিয়া নামে একজনের নাম স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বেই শুনেছিলাম। ইহা আমার জানা নাই যে, বন্দের আলী মিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের ভাড়ারা এলাকায় আমার বর্ণিত সংঘটিত হত্যাকা-ের অভিযোগ ছিল কি না। আমাদের এলাকায় রাজাকার বাহিনীর সদস্য কারা ছিল তাদের নাম আমার স্মরণ নাই।
সাক্ষী জেরার জবাবে আরও বলেন, আটককৃতদের মিলিটারী গাড়ি করে নুরপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার কথাটি আমি নতুব আলী কারিকর এর কাছে শুনেছিলাম। নতুব আলী কারিকর এর বাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে। হারুন শেখ, সিরাজ শেখ, তালেব শেখ, জব্বার শেখ, নুরুল ইসলামের ছেলে মেয়েরা জীবিত আছে। ২০০৮ সালের অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা আমার স্মরণ আছে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের কথা আমার স্মরণ নেই। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা আমার স্মরণ আছে। রফিকুল ইসলাম বকুল একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তবে ১৯৯১ সালে নির্বাচত হয়েছিলেন কি না তা আমার স্মরণ নেই। ১৯৯১ সালে কে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তা আমার স্মরণ নেই।
ইহা সত্য যে, আমাদের ভাড়ারা থেকে বিপুল ভোট পেয়ে মাওলানা সোবহান সাহেব বিজয়ী হয়েছেন।
ইহা সত্য নয় যে, আমি ৭১ সালে মাওলানা সোবহান সাহেবকে চিনতাম না। ইহা সত্য নয় যে, আমি শেখানো মতে মাওলানা সোবহানের বিরুদ্ধে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম বা আমার বর্ণিত মতে কোন ঘটনাই ঘটেনি।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=149998