৫ জুন ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে ১৫ তম সাক্ষীর জবানবন্দী ডিফেন্স পক্ষের জেরা আজ
২৩ জুন ২০১৪, সোমবার,
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৫ তম সাক্ষী মমতাজ উদ্দিন মন্টু গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-২ এ তার জবানবন্দী পেশ করেছেন। আজ সোমবার সাক্ষীকে জেরা করবে ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড করেন। গতকাল ডিফেন্স পক্ষে ট্রাইব্যুনালে আরো উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট এস.এম শাহজাহান কবির, এডভোকেট আসাদুল ইসলাম ও  এডভোকেট আবদুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ। উল্লেখ্য, এর আগে মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে আরো ১৪ জন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার ১৪ তম সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার পরে তাকে  জেরা করেন ডিফেন্স আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম।
১৫ তম সাক্ষীর জবানবন্দী (সংক্ষিপ্ত)
আমার নাম মমতাজ উদ্দিন মন্টু, পিতা- রায়হান উদ্দিন বিশ্বাস (মৃত), মাতা- সারা খাতুন (মৃত)। গ্রাম- দোগাছি, থানা- পাবনা সদর, জেলা- পাবনা। আমার বর্তমান বয়স ৬৬ বছর। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২২ বছর। আমি ১৯৭৩ সালে এস,এস,সি পাস করেছি। আমার কাপড়ের ব্যবসা ছিল। বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করেছি।
২৫ মার্চ, ১৯৭১ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার মতো পাবনাতেও নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। মাঝরাতে পাবনা পুলিশ লাইনে আক্রমণ করে। তখন পাবনার আপামর জনতা পুলিশের সহায়তায় এগিয়ে আসে। এই অবস্থা ২৯ মার্চ পর্যন্ত চলে। ২৯ তারিখেই সর্বস্তরের জনতা ও পুলিশ বাহিনীর আক্রমণের ফলে সকল পাক সেনা সদস্যই নিহত হয়। ঐ দিন বিকেলে পাকিস্তান সেনা ও বিমান বাহিনী পাবনায় বিমান হামলা চালায়। এতে অনেক সাধারণ মানুষ হতাহত হয়। ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ পর্যন্ত পাবনা মুক্ত থাকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাবনা শহরে প্রবেশের পর মাওলানা সুবহান পাবনাস্থ স্বাধীনতা বিরোধীদের সংগঠিত করতে থাকে এবং পাকসেনাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। মাওলানা সুবহান পাবনায় কারা আওয়ামী লীগ করেন, কোন এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত, কোন এলাকায় স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোকের সংখ্যা বেশি ইত্যাদি তথ্য সম্বলিত একটি তালিকা পাক সেনাদের হাতে হস্তান্তর করে। আমি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি এবং একজন সংগঠক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পাবনা শহরে যাওয়া আসার মধ্য দিয়ে লোকমুখে এসব বিষয় জানতে পারি।
 মে মাসের প্রথম সপ্তাহে জানতে পারি যে, পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শান্তি কমিটি গঠন উপলক্ষে একটি সভা হয়। সেই বৈঠকে মাওলানা সুবহান জেলা শান্তি কমিটির সেক্রেটারী হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১০ মে পাবনা শহরের ছাত্র নেতা শেখ শহিদুল্লাহ আমাদেরকে সংবাদ দেয় যে, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক কিছু ছেলেরা এক সংগে বসে কিছু কথা বলবেন। সেমোতাবেক ১১ মে শহিদুল্লাহ চরের দিকে আমাদের গ্রামের পাশের গ্রাম কুলোনিয়ায় প্রবেশ করেন এবং সেখানে একটি প্রাইমারী স্কুলে আমরা ৫/৭ জন ছাত্র যুবক বসে কথা বলি।
বেলা ১১টা সোয়া ১১টার দিকে দেখতে পাই প্রচ- শব্দ করে আর্মি কনভয় আসছে এবং গাড়ীগুলোর সামনে মাওলানা সুবহান সাহেবের সেই সাদা গাড়িটি ছিল এবং তিনি সেখানে ছিলেন। গাড়ীগুলো এসে রাস্তা এবং স্কুল মাঠে থামে। আমরা পিছন দিকে স্কুলে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে জংগলের ভিতর দিয়ে দক্ষিণ দিকে সমুজুদ্দিনের বাড়ীর কাছে একটি জংগলে আশ্রয় নেই। তখন চারদিকে প্রচ- গোলাগুলি হচ্ছিল। আমি এখান থেকে দেখতে পাই সমুজুদ্দিন তার বাড়ী থেকে বেরিয়ে একটি বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছিল। ঐ সময় মাওলানা সুবহানের হাতের ইশারায় পাকসেনারা গুলী করে সমুজুদ্দিনকে হত্যা করে। একই সময় একই জায়গায় সমুজুদ্দিনের পাশের বাড়ীর আমিন উদ্দিন এর স্ত্রী হাসিনা পালাতে আসলে তাকেও গুলী করে হত্যা করা হয়। একই জায়গায় সমুজুদ্দিনের স্ত্রী রাহাতান গুলীবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়।
এরপর মাওলানা সুবহান এবং পাকসেনাদের কনভয় দোগাছির দিকে চলে যায়। বেলা ১২টা সাড়ে ১২ টার দিকে দোগাছির দিক থেকে আগুনের শিখা দেখতে পাই এবং গোলাগুলীর আওয়াজ শুনতে পাই। মানুষের চিৎকার, চেচামেচি শুনতে পাই এবং তাদেরকে দিকবিদিক ছোটাছুটি দেখতে পাই। আমার অবস্থান থেকে এই ঘটনাস্থলটির দূরত্ব আধা মাইলেরও কম হবে। আমরা মুসলমানদের লাশগুলোকে ধর্মীয় মতে আত্মীয় পরিজনদেরকে নিয়ে দাফন করি। গুলীবিদ্ধ রাহাতুন নেসা ৭/৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন বলে শুনেছি। হিন্দুদের লাশগুলে একত্রিত করে পোড়া মন্দিরের সামনে গর্ত করে মাটি চাপা দেই। এই ঘটনার পরদিনই আমি এবং আমার সংগীরা ভারতে চলে যাই এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ২৮ জুলাই, ১৯৭১ দেশে ফিরে সুজা নগর চলে যাই।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=149736