২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আসামীপক্ষের যুক্তি প্রদর্শনের ৮ম দিনে বললেন আব্দুস সোবহান তরফদার: ডকে দাঁড়িয়ে অসত্যের আশ্রয় গ্রহণকারী সাক্ষীর কথায় আজহারকে শাস্তি দেয়া যায় না
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, বুধবার,
১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আনীত অভিযোগের বিপরীতে আসামীপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে অষ্টম দিনের মত যুক্তিতর্ক পেশ করেন আসামীপক্ষ। আজহারুল ইসলামের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুস সোবহান তরফদার গতকাল যুক্তি-তর্ক পেশ করার পর আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। গতকাল তিনি আজহারের বিরুদ্ধে আনীত ৬ টি অভিযোগের মধ্যে ৫ ও ৬নং চার্জের উপর যুক্তিতর্ক পেশ করেন। আজ তিনি আদালতে ইতোপূর্বে প্রদর্শিত ও দাখিলকৃত ডকুমেন্টের উপর শুনানি করবেন।
গতকালের শুনানিতে আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন,সাক্ষী মনসুরা এবং তার স্বামী মোস্তফা মিয়ার প্রদত্ত মৌখিক সাক্ষ্য এবং অন্যান্য ডকুমেন্টের মধ্যে বিস্তর অমিল রয়েছে। মনসুরার বয়স ১৯৭১ সালে ১৭ বছর, ঐ সময় তার কোন সন্তানাদি না থাকা ও গর্ভবতী থাকার তথ্য সঠিক নয়। ডকে দাঁড়িয়ে অসত্যের আশ্রয় গ্রহণকারীর সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে আজহারুল ইসলামকে শাস্তি দেয়া যায় না। সাক্ষী মনসুরা নিজেকে বীরাঙ্গনা দাবি করলেও তালিকায় তার নাম নেই। তার স্বামীও তা ডকে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, ৫ নং চার্জের একমাত্র দেখা সাক্ষী এবং ভিকটিম দাবিদার সাক্ষী মনসুরা খাতুন। তিনি তার জবানবন্দীতে নিজেকে বীরাঙ্গনা দাবি করেছেন। কিন্তু রংপুর জেলার বীরাঙ্গনার তালিকায় তার নাম নেই। তার স্বামী মোস্তফা মিয়াও এটা স্বীকার করেছেন যে, বীরাঙ্গনা তালিকায় তার স্ত্রীর নাম নেই। ১৯৭১ সালের ভাদ্র মাসের কথিত ঘটনার সময় তিনি নি:সন্তান ছিলেন এবং তার বয়স তখন ১৭ বছর  ছিল মর্মে জবানবন্দী দিয়ে সত্য গোপন করেছেন। তার নিজের জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৪৫। তার প্রথম সন্তান সেতারা বেগমের জন্ম তারিখ ভোটার আইডি কার্ড ও ভোটার তালিকা মতে ১ মে ১৯৬৪। সেতারার পরে জয়তুনসহ তার আরো ৫টি সন্তান হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের ভোটার আইডি কার্ড আছে। সর্বশেষ সন্তানের জন্ম হয়েছে ১৯৬৯ সালে।
তিনি আরো বলেন, আমরা তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি মনসুরা বেগম ও তার কন্যা সেতারা বেগমের ভোটার আইডি কার্ডের জন্ম তারিখ তদন্তকালে সঠিক পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং মনসুরা ১৯৭১ সালের ভাদ্র মাসে ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন মর্মে অসত্য কথা বলেছেন। ঐ সময় তার বয়স ১৭ বছর ছিল মর্মে প্রদত্ত বক্তব্যও সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ২৬ বছর। ধর্ষণ হতে পারে যে কোন বয়সে। সন্তানের মা হওয়া বা না হওয়াও এ ক্ষেত্রে শর্ত নয়। কিন্তু ধর্ষণ প্রমাণ করতে গিয়ে সাক্ষী কেন বয়স চুরি করলেন এবং গর্ভবতী ছিলেন,নি:সন্তান ছিলেন ইত্যাদি অসত্যের আশ্রয় নিলেন তা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এই সাক্ষীকে বিশ্বাস করার কোন সুযোগ নেই।
আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন, সিগারেট কোম্পানীর দারোয়ান মোস্তাক দাঁড়িপাল্লা মার্কা করতো। আর মনসুরার স্বামী ভারতে গেছে বিধায় মোস্তাক আর্মি নিয়ে আসে এবং আর্মি কর্তৃক ধর্ষিতা হওয়ার পর আজহার মনসুরাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যায় এবং চুলের মুঠি ধরে গাড়িতে উঠায় মর্মে প্রদত্ত বক্তব্যও সত্য নয়। একথা মনসুরা তার স্বামী ছাড়া ৪২ বছরে অন্য কাউকে বলেনি। প্রদত্ত সাক্ষ্য-প্রমাণে যথেষ্ট অমিল থাকায় এই বক্তব্য সত্য ধরার কোন সুযোগ নেই। কোনটাই বা সত্য ধরা যায়। সবই পরস্পরবিরোধী।
এডভোকেট তরফদার বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মনসুরা ও তার স্বামীর জবানবন্দী দেয়ার পর তাদের ছেলের চাকরি হয়েছে ক্যান্টনমেন্টে মাস্টার রোলে। তার আগে তার ছেলে রিকশা চালাতো। স্বামী মোস্তফা ট্রেনিং-এর জন্য ভারতে গিয়েছিল এবং মুক্তিযোদ্ধা ছিল মর্মে বক্তব্য রাখলেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার নাম নেই।
তিনি বলেন, মনসুরার ধর্ষণের ঘটনাটি সাক্ষী মেছের উদ্দিন ঘটনার পর তার বাড়িতে গিয়ে শুনেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। আর মনসুরা বলছেন যে, এ ঘটনা তিনি তার স্বামী ছাড়া ৪২ বছরে অন্য কাউকে বলেননি। মুজিবুর মাস্টারের শোনা তথ্যও একই রকম।
আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন, ৬ নং চার্জের ভিকটিম শওকত হোসেন রাঙ্গাকে  আসামী ডান হাত দিয়ে তার ডান গালে থাপ্পড় মেরেছেন মর্মে সাক্ষী উল্লেখ করেছেন। ডান হাত দিয়ে মারলে তো বাম গালে লাগার কথা। তার দুই ভাইয়ের বক্তব্যে রয়েছে অমিল। থাপ্পড় মারার যে কাহিনী এখানে বর্ণনা করা হয়েছে তাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রকাশ্য দিবালোকে আসামী আজহারের কাঁধে অস্ত্র ছিল, তাকে দেখে ভিকটিম জয় বাংলা বললো, তার পর আসামী তাকে ডাকলেন, আর ভিকটিম ভদ্র ছেলের মত তার কাছে গেল, তার পর তিনি থাপ্পড় মারলেন। এটা বিশ্বাস করার মত নয়। কারণ এরূপ কাউকে দেখার পর তো ভয়ে পালানোর কথা ছিল। সাক্ষী আরো বলেছেন যে, সেখানে আরো অনেকে ছিল যারা এ ঘটনা দেখেছে। কিন্তু তারা কেউ সাক্ষী দিতে আসেনি।
গতকাল আসামী পক্ষে এডভোকেট আব্দুস সুবহান তরফদারকে সহায়তা করেন এডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির, রায়হান উদ্দিন, মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন প্রমুখ। অপরদিকে সরকার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, আলতাফ উদ্দিন, মোখলেসুর রহমান বাদল, রেজিয়া সুলতানা চমন প্রমুখ।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=157233