১৯ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আসামীপক্ষের যুক্তি প্রদর্শনের ৭ম দিনে বললেন আব্দুস সোবহান তরফদার: দালিলিক এবং মৌখিক সাক্ষ্য কোনটাতেই আজহারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ হয় না
৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, মঙ্গলবার,
ঝাড়–য়ার বিলে হত্যার শিকার ১৪শ লোকের পরিবারের কোন সদস্য  বা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো থেকেও কেউ সাক্ষ্য দিতে আসেনি
১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আনীত অভিযোগের বিপরীতে আসামীপক্ষের চূড়ান্ত আর্গুমেন্ট (যুক্তি-তর্ক) উপস্থাপন অব্যাহত রয়েছে। গতকাল  সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত  ট্রাইব্যুনালে সপ্তম দিনের মত যুক্তি-তর্ক পেশ করেন আসামীপক্ষ। আজহারুল ইসলামের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুস সোবহান তরফদার গতকাল যুক্তি-তর্ক পেশ করার পর আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। গতকাল তিনি আজহারের বিরুদ্ধে আনীত ৬ টি অভিযোগের মধ্যে ৩ ও ৪নং চার্জের উপর যুক্তি-তর্ক পেশ করেন। আজ তিনি বাকি ২টি অভিযোগের উপর শুনানি করবেন।
গতকালের শুনানিতে আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন, ঝাড়ুয়ার বিলে ১২শ লোককে  গণহত্যা ও ২শ লোককে অপহরণের পরে হত্যার ঘটনায় ৪নং সাক্ষী মেছের উদ্দিন আজহারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন তার জবানবন্দীতে। কিন্তু জেরাতে তিনি স্বীকার করেছেন যে তিনি আজহারকে দেখেননি। তার বাড়িও ঝাড়ুয়ার বিল সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্ত ১২/১৪টি গ্রামের মধ্যে নয়। জবানবন্দীর বক্তব্য অনুসারে তিনি দেখেছেন অনেক দূর থেকে। এত বড় একটা জঘন্য ঘটনায় মাত্র ২জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর একজন এই মেছের উদ্দিন। এত দূর থেকে দেখা যেমন সত্য নয় তেমনি জেরাতেও তিনি দেখার কথা স্বীকার করেননি। কাজেই তার সাক্ষ্য দ্বারা ঝাড়ুয়ার বিলের ঘটনার সাথে আজহারুল ইসলামের জড়িত থাকার কথা আদৌ প্রমাণিত হয় না।
তিনি বলেন, ৩নং অভিযোগ প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন হাজির করেছেন ৫নং সাক্ষী আব্দুর রহমানকে। তার বাড়িও ঐ ১২/১৪ গ্রামের মধ্যে নয়। তিনি কিভাবে দেখলেন তা স্পষ্ট নয়। এই চার্জে প্রত্যক্ষদর্শী ২জন সাক্ষীর কেউই এই ১২/১৪ গ্রামের নয় এবং তারা ভিকটিম পরিবারেরও কেউ নয়। একজন দেখেছেন ৩ কিলোমিটার দূর থেকে , আরেক জন দেখেছেন দেড় কিলোমিটার দূর থেকে! প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের অবস্থাই যখন এই তার পওে শোনা সাক্ষী তিন জনের বক্তব্য ধর্তব্যের মধ্যে আসে না। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা আবার তারা যে দেখেছেন একথা তদন্তকারি কর্মকর্তাকে বলেননি।
তিনি আরো বলেন, ৩নং চার্জে বর্ণিত ঘটনা অনুসারে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে ঝাড়–য়ার বিল সংলগ্ন ১২/১৪ টি গ্রামে পাকিস্তান আর্মি ও তাদের সহযোগীরা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। তাদের ভয়ে এসব গ্রাম থেকে যারা ঝাড়–য়ার বিলে আশ্রয় নেয় তাদের মধ্যে ১২শ লোককে গুলী করে হত্যা এবং ২শ লোককে অপহরণ করে পরে হত্যা করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রত্যক্ষদর্শী বা শোনা সাক্ষী মোট ৫ জনের কেউই এই ১২/১৪ গ্রামের বাসিন্দা নয় এবং তারা নিহতদের পরিবারেরও কেউ নয়। হত্যার শিকার মোট ১৪শ লোকের একটি পরিবার থেকেও কেউ তাদের আপনজনদের হত্যা এবং সম্পদহানির বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে আসেনি! ১৪শ লোকের কারোই কি আপনজনদের প্রতি দরদ নেই! এসেছে অনেক দূরবর্তী সাক্ষী যাদের নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। মায়ের চেয়ে মাসীমার দরদ বেশী।
আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন,ঝাড়ুয়ার বিল এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে পুরো এপ্রিল মাস পর্যন্ত পাকিস্তান আর্মির সাথে মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙ্গালী সৈন্যদের যুদ্ধ চলছিল। এটা সরকার পক্ষের প্রদর্শিত (এক্সিবিট) ডকুমেন্টে রয়েছে। সেখানে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধাও মারা গেছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। এসব ডকুমেন্টের কোনটার সাথেই আজহারুল ইসলাম জড়িত ছিলেন মর্মে কোন তথ্যপ্রমাণ নেই। মাসাধিক কাল যুদ্ধ হয়েছে। শুধু ১৭ এপ্রিলের ঘটনা নয়। তাদের বক্তব্য কোনটা সত্য? দালিলিক প্রমাণ না মৌখিক সাক্ষ্য ? দুইটাই তো পরস্পর বিরোধী।
তিনি বলেন, ৪নং চার্জে প্রফেসার চিত্তরঞ্জনসহ অন্যদের হত্যার সাথে আসামীকে জড়ানো হয়েছে যার কোন প্রমাণ তারা দাঁড় করাতে পারেনি। একজন সাক্ষী আজহারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। কোন অপরাধ করতে দেখেননি। সাক্ষী শোভা কর আজহারের সাথে একই ক্লাসে পড়েছেন বলে উল্লেখ করলেও ডকুমেন্টে তা প্রমাণ কওে না। কারণ সরকার পক্ষই যে ডকুমেন্ট দিয়েছেন তাতে দেখা যায় যে, আজহারুল ইসলামের  সেশন ১৯৬৭-৬৮ আর শাভা করের সেশন ১৯৭০-৭১। তার বক্তব্য সত্য নয়। আসামীকে তিনি দেখেছেন দাঁড়িয়ে থাকতে। কিন্তু আসামী কিছু করেছে মর্মে তিনি কিছু বলেননি। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রতন চন্দ্র দাস কারমাইকেল কলেজের পাচক ছিলেন মর্মে উল্লেখ করেছেন। তিনি ঐ সময়কার প্রিন্সিপ্যালের নাম জানেন না, ছাত্রলীগের সভাপতি বা কোন দায়িত্বশীলের নাম জানেন না। তিনি জানেন শুধু আজহারের নাম । এটা কি করে সম্ভব?
এডভোকেট তরফদার বলেন,আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ গ্রেফতারের পর আজহারুল ইসলাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল যদি না হতেন এবং দলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না রাখতেন তাহলে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হতো না। তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন,৩ এবং ৪ নং অভিযোগ প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তাদের বর্ণিত ঘটনার সাথে এটিএম আজহারুল ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। তাদের দাখিলকৃত ডকুমেন্ট এবং মৌখিক সাক্ষ্য কোনটাতেই তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে না।
গতকাল আসামী পক্ষে এডভোকেট আব্দুস সুবহান তরফদারকে সহায়তা করেন এডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির, রায়হান উদ্দিন প্রমুখ। অপরদিকে সরকার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, আলতাফ উদ্দিন, তুরিন আফরোজ, রেজিয়া সুলতানা চমন প্রমুখ।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=157093