২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে ২৪তম সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা শেষ: পরবর্তী সাক্ষী আজ
২৭ আগস্ট ২০১৪, বুধবার,
কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ২৪তম সাক্ষী সামছুল আলম গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিয়েছেন। জবানবন্দী শেষে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২  সাক্ষীকে  জেরা করেন ডিফেন্স আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। গতকাল আসামী সহযোগী আইনজীবী ছিলেন আবদুস সাত্তার পালোয়ান, আসাদুল ইসলাম। অন্যদিকে প্রসিকিউসন পক্ষে  ছিলেন সুলতান মাহমুদ সিমন, রিজিয়া সুলতানা প্রমুখ। আজ বুধবার ২৫তম সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে। 
সাক্ষীর জবানবন্দী
আমার নাম মোঃ সামছুল আলম, পিতা- শহীদ মহিউদ্দিন প্রামাণিক।  আমার বর্তমান বয়স ৫৭ বছর। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স আনুমানিক ১৪/১৫ বছর ছিল, ঐ সময় আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশুনা করতাম। আমি এসএসসি পাস করেছি। বর্তমানে কৃষি কাজ করি।
জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, আমার বাবা সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। আমাদের এলাকার অধিকাংশ লোকই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। ১৯৭১ সালের ১২ মে আনুমানকি সকাল ৬টার দিকে আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকে প্রচ- গোলাগুলীর আওয়াজ শুনতে পাই এবং আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাই। এ সময় গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল এবং বলাবলি করছিল মিলিটারি এসেছে যে যার মতো পালাও। তখন আমার দাদু আমাদের পরিবারের সকল সদস্যকে আত্মরক্ষার জন্য ৭/৮ কিঃমিঃ দূরে গাজনার বিলের দিকে যেতে বলে। আমার দাদু নিজে যেতে না চাইলে আমি ও আমার বাবাও বাড়ি থেকে কোথাও যাইনি। বেলা আনুমাণিক ১২টার দিকে একটি সাদা জীপ গাড়ির সাথে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১টি গাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে এসে থামে। আমাদের বাড়িটি জেলা পরিষদ সড়কের সংলগ্ন ছিল। সাদা গাড়ি থেকে সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত দাড়িওয়ালা একজন লোক নামে তার সাথে আরেকজন নামে সে সুবহান মাওলানা। আমার বাবা আমাদের বাড়ির বাইরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়েছিল। সুবহান মাওলানাকে দেখে আমার বাবা হাত উঁচু করে তার দিকে এগিয়ে যায়। তখন সুবহান মাওলানা হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে উনি একজন নেতা। সংগে সংগে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমার বাবাকে গুলী করে। গুলী খেয়ে আমার বাবা ৩/৪ হাত উঁচুতে উঠে মাটিতে পড়ে যান। আমি ঘটনাস্থল থেকে ৫০ গজ দূরে দুই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখছিলাম। আমার বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর সুবহান আমার বাবাকে ২/৩টা লাথি মেরে বলতে থাকে, ‘দেখ জয় বাংলা কেমন।’ তখন আমার দাদু আমার হাত ধরে ভয়ে বাড়ির পিছন দিক দিয়ে আখ ক্ষেতের দিকে যেতে থাকলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমার দাদুকে লক্ষ্য করে গুলী করে। কিন্তু গুলীটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং আমরা আখ ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে জীবন রক্ষা করি (সাক্ষী এই সময় অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন)।
আমরা আখ ক্ষেতের মধ্যে থেকে দেখতে পাই আমাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে এবং গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকেও গোলাগুলীর আওয়াজ শুনতে পাই। আনুমাণিক বেলা দেড়টা ২টার দিকে পাক সেনারা চলে যায়। এরপর আমরা আখ ক্ষেত থেকে বেরিয়ে আসি এবং শুনতে পাই পাক সেনাদের গুলীতে গ্রামের বেশ কয়েকজন লোক মারা গেছে। তারা হলেন বাজু প্রামাণিক, ঝাড়– ম-ল, মজিবর শেখ, রজব প্রামাণিক প্রমুখ। আমাদের বাড়িতে এসে বাড়ি ভস্মীভূত হয়ে গেছে দেখতে পাই। আমাদের দুটি ধামড়া গরু আগুনে পুড়ে মরে পড়ে থাকতে দেখি। ঐ দিন রাত আনুমাণিক ১০টার দিকে গ্রামের লোকজন এসে আমার বাবার লাশ দাফন সম্পন্ন করেন। উক্ত দাফন অনুষ্ঠানে এসএম সামছুল আলম, খোরশেদ আমার বাবার অনেক রাজনৈতিক কর্মী যোগ দান করেন।
আংশিক জেরা
প্রশ্ন : আপনি কত সালে কোন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন ?
উত্তর: আমি ১৯৭৩ সালে সাতবাড়িয়া হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছি।
প্রশ্ন: আপনি কী খোরশেদ আলমকে চিনতেন ?
উত্তর:  ১৯৭১ সালে খোরশেদ আমার সংগে একই ক্লাসে পড়ালেখা করতো। ১৯৭১ সালে খোরশেদ কৃষিকাজ করতো। ইহা সত্য নয় যে, আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাশের গ্রামের নাম শ্যামপুর। আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকের গ্রামটির নাম ভাটপাড়া। সিংহনগর গ্রামটি ভাটপাড়ার পশ্চিমে। শ্যামনগর গ্রামটি ভাটপাড়ার পশ্চিমে। ভাটপাড়া গ্রামটি জেলা পরিষদ রাস্তার ধার দিয়ে আনুমানিক ১ কিঃমিঃ লম্বা। ইহা সত্য যে, সিংহনগর ও শ্যামনগর গ্রামও ঐ রাস্তার ধার দিয়ে ১ থেকে দেড় কিঃ মিঃ করে লম্বা।
প্রশ্ন: আপনাদের বাড়ি থেকে গাজনার বিলটি কোন দিকে ?
উত্তর: গাজনার বিলটি আমাদের বাড়ি থেকে পূর্ব দিকে। ১৯৭১ সালে আমার বাবা সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, তবে সেক্রেটারি কে ছিলেন মনে নেই। ১৯৭০ সালে মাওলানা সুবহান সাহেব আমাদের এলাকায় ভোটে দাঁড়ান নাই।
আইনজীবীর জেরার জবাবে  সাক্ষী আরো বলেন, ইহা সত্য যে, ৭০ সালের নির্বাচনে আমাদের এলাকায় আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলের কে কে প্রার্থী ছিলেন তা বলতে পারবো না। ১৯৭১ সালে সাতবাড়িয়া গ্রামটি আমাদের বাড়ি থেকে ৩/৪ কিঃমিঃ পশ্চিম দিকে রাস্তার ধারে ছিল। ১৯৭১ সালে আমাদের সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন জনৈক কমর। ঐ সময়ে আমাদের এলাকার মেম্বার ছিলেন আমার দাদু। ১৯৭১ সালে মাওলানা সাহেবের বাড়ি কোথায় ছিল বলতে পারবো না, তবে শুনেছি পাবনা শহরে তার বাড়ি ছিল। ১৯৭১ সালে মুসলিম লীগ নেতা টিক্কা খান ওরফে আমিন উদ্দিনকে আমি চিনতাম। ১৯৭১ সালে পিস কমিটি কি জিনিস তা চিনতাম না। রাজাকার বাহিনী ছিল আমি জানতাম। তবে আমাদের এলাকায় রাজাকার বাহিনী কবে গঠিত হয়েছিল তা বলতে পারবো না। সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের সিংহনগর ও শ্যামনগর এলাকায় রাজাকার ছিল। রাজাকার মোস্তফার বাড়ি ছিল সিংহ নগরে। মোস্তফা ছাড়া অন্য কোনো রাজাকারের নাম আমার এই মুহূর্তে মনে নেই। সাতবাড়িয়া স্কুলটি ফকিতপুর গ্রামে। ফকিতপুর গ্রামের দবিরকে আমি চিনি না। আমার জবানবন্দীতে যে খোরশেদের কথা বলেছি তার বাড়ি আমার বাড়ি থেকে ৩ সাড়ে ৩ মাইল পশ্চিম দিকে। তার বাড়ি রাস্তা থেকে কোন দিকে কতদূর তা আমি জানি না। তার বাড়িতে আমি কখনও যাইনি। তার বাড়ি কোন গ্রামে আমি জানি না। তবে তার বাড়ি সাতবাড়িয়া এলাকায় ছিল, এই এলাকাটি অনেক বড়।
আমি মাওলানা সুবহান সাহেবকে আমাদের এলাকায় ১৯৭০ সালে মিটিং করতে দেখেছি। ১৯৭০ সালে আমাদের ইউনিয়নে জামায়াতের কারা কারা নেতা ছিলেন তা বলতে পারবো না। ১৯৭০ সালে আমাদের এলাকায় জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের মিটিং করতে দেখিনি। ১৯৭৯ সালে আমাদের এলাকায় এমপি কে ছিল তা বলতে পারবো না। আওয়ামী লীগ এমপি প্রার্থী কে ছিলেন বলতে পারবো না। ইহা সত্য নয় যে, ১৯৭১ সালে আমি ছোট থাকায় কোনো রাজনৈতিক দলের জনসভায় যেতাম না। আমার বাবার জানাযায় ইমামতি করেছিলেন আব্দুল মজিদ সাহেব। ইহা আমার জানা নেই যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজাকারদের কাউকে আটক করা হয়েছিল কিনা। আমাদের বাড়ি সংলগ্ন জেলা পরিষদ সড়ক থেকে পদ্মা নদী ৮০০ গজ উত্তরে।
ইহা সত্য নয় যে, ১৯৭১ সালে বা তার আগে মাওলানা সুবহান সাহেবকে চিনতাম না বা আমার বর্ণিত মতে ১২ মে ১৯৭১ তারিখে আমার কথিত মতে কোনো ঘটনা ঘটেনি। ইহা সত্য নয় যে, আমি শেখানো মতে সাক্ষ দিলাম। ইহা আমার জানা নেই যে, ১১ মে মাওলানা সুবহানের কোনো মেয়ে মারা গিয়েছিল কিনা, ইহা সত্য নয় যে, পরদিন ১২ মে তার মেয়ের জানাযায় সে ইমামতি করেছিল।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=155531