১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
ডিফেন্সপক্ষে দুই মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষ্য: যুক্তি উপস্থাপন ২৭ এপ্রিল; ডালিম হোটেলের নির্যাতনের সাথে মীর কাসেম আলী জড়িত ছিলেন না
২৪ এপ্রিল ২০১৪, বৃহস্পতিবার,
কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন দুই মুক্তিযোদ্ধা। গতকাল বুধবার তারা ট্রাইব্যুনালে এসে ডিফেন্সপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে তারা বলেছেন ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে নির্যাতনের সাথে মীর কাসেম আলী জড়িত ছিলেন বলে কিছু শুনি নাই। সাক্ষীদ্বয় হলেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী ও আবু তাহের খান। পরে তাদের জেরা করেন প্রসিকিউশন পক্ষ। এই মামলায় চূড়ান্ত আর্গুমেন্টের জন্য আগামী ২৭ এপ্রিল দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল-২।
দ্বিতীয় সাক্ষীর জবানবন্দি
আমার নাম মোহাম্মাদ আলী, পিতা- মরহুম হাজী নাজির আলী, মাতা- মরহুমা বেগম জাকিয়া খাতুন। ঠিকানা- ১১৮ নং ঘোষাল কোয়ার্টার, ষ্টেশন রোড, থানা- কোতয়ালী, জেলা- চট্টগ্রাম। আমার বর্তমান বয়স ৫৯/৬০ বছর। আমি ছোটখাট ব্যবসা করি। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ১৬/১৭ বছর। ১৯৭১ সালে আমি চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষার্থী ছিলাম।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে আমি এবং আমার অপর ৩ বন্ধু নূরুদ্দীন চৌধুরী, মোঃ রফিক, বাবুল মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমেদের গাইডেন্সে ছালনাইয়া হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে হরিনা ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। সেখানে আমরা ২৮ দিনের সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করি। ট্রেনিং শেষে ২০ নভেম্বর সাবরুম হয়ে বাংলাদেশের রামগড় দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি। ২১ নভেম্বর আমরা ফেনী নদীর পাড়ে ঈদের নামাজ আদায় করি। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে, নৌকায়, বাসে চড়ে আমি ২৪ নভেম্বর আমাদের চট্টগ্রামের ঘোষাল কোয়ার্টারস্থ বাসায় পৌঁছি। আমার অন্য ৩ বন্ধু যার যার বাসায় যায়। আমি বাবা-মা’র সংগে দেখা করার পর চট্টগ্রাম শহরস্থ ব্যাপ্টিষ্ট চার্চ এর পার্শ¦বর্তী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গোপন আশ্রয়ে যোগাযোগ করি। আমাদের কমান্ডার ছিলেন নূর উদ্দিন চৌধুরী। তাঁর নেতৃত্বে ‘হিট এন্ড রান’ পদ্ধতিতে অপারেশনে অংশ নেই। সেখানে থাকা অবস্থায় আমরা জানতে পারলাম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ, সি আর বি, ষ্টেডিয়াম এবং টেলিগ্রাম অফিসে পাকিস্তান সেনারা মানুষদেরকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করতো। এ ছাড়াও জানতে পারি হাজারী গলি সংলগ্ন ডালিম হোটেলও একটি নির্যাতন ক্যাম্প ছিল। মতিউর রহমান মতি ওরফে মইত্যা গুন্ডা এই ডালিম হোটেলটি দখলে নিয়ে তার সাথে আরো কতিপয় রাজাকার এবং কিছু বিহারী ছেলেকে নিয়ে এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনা করতো ও সাধারণ মানুষ জনকে ধরে এনে নির্যাতন করতো। এই মতি গুন্ডাকে আমি চিনতাম সে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহের টিকেট কালোবাজারী করতো। ডালিম হোটেলের মালিক ছিলেন চন্দ্র মোহন নাথ। শুনেছি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডালিম হোটেলের মালিক মতি গুন্ডার বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিল। ডালিম হোটেলে নির্যাতন এবং কর্মকান্ডের সাথে মীর কাশেম আলী সাহেব জড়িত ছিলেন মর্মে আমি কখনও কিছু শুনিনি। ডালিম হোটেলটি আমার বাসা থেকে পূর্বদিকে আধা কিঃমিঃ দূরে ছিল। এই আমার জবানবন্দী।
দ্বিতীয় সাক্ষীকে জেরার উল্লেখযোগ্য অংশ
জেরার জবাবে সাক্ষী বলেন, আমার জন্ম তারিখ ১০ মে, ১৯৫৪। ১৯৭১ সালে যে এস.এস.সি পরীক্ষা হয়েছিল তাতে আমি অংশ গ্রহণ করিনি। হরিনা ক্যাম্পটি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান, ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন ও সাতকানিয়ার ডাক্তার ফয়েজ এই ক্যাম্পটিতে ইপিআর ও অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তাদের অবস্থান ছিল। অপরটি ছিল ইয়োথ ক্যাম্প। এটি মীরের সরাইয়ের মন্টু বাবু পরিচালনা করতেন। আমাকে ট্রেনিং দিয়েছিল নায়েক সুবেদার বাদশা, আমরা ৮-১০ জন এক সংগে ট্রেনিং নিয়েছিলাম। ক্যাম্পের কাছেই আমাদেরকে একটি বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ট্রেনিং দেয়া হতো।
জেরার অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, ইহা সত্য নয় যে, একমাত্র ত্রিপুরায় মেলাঘর (২নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার) ছাড়া ভারতের অভ্যন্তরে অন্য কোন ক্যাম্পের অধীনে কোথাও বাংলাদেশী সেনাদের নিয়ন্ত্রণে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন ট্রেনিং হতো না। ইহা আমার স্মরণ নাই যে, আমি যেখানে ট্রেনিং নিয়েছিলাম সেখানে কোন সামরিক কর্মকর্তা ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। দেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর পূর্বে আমাদেরকে ব্রিফ করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশরাফ সাহেব এবং সাতকানিয়ার ডাক্তার ফয়েজ। আমাদের ৪ জনকে বাদশার নেতৃত্বে অনার্স দেওয়া হয়, প্রত্যেককে একটি করে ষ্টেপগান দেয়া হয় এবং গুলির বাক্স দেয়া হয়। ফেনী নদীর তীরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আমরা সেই ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। আমাদের অস্ত্র এবং গুলি সেই ক্যাম্পে রেখে সকাল ১১টায় ঈদের নামাজ পড়ি।
প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, ১৯৭০-৭১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম শহর ও চট্টগ্রাম কলেজে ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতৃবৃন্দ কারা ছিলেন তা আমি জানি না। আমরা ৭ ভাই ও ৪ বোন, ভাইদের মধ্যে আমি বড়। আমরা নভেম্বর মাসে চট্টগ্রাম-এর কোথাও কোন অপারেশন করিনি। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ষ্টেশন রোডের একটি পেট্টোল পাম্পে গ্রেনেড হামলা করেছিলাম। আমি মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মোঃ এমরানের নাম শুনিনি। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নাম শুনেছি।
ইহা সত্য নয় যে, এ ছাড়াও জানতে পারি হাজারী গলি সংলগ্ন ডালিম হোটেলও একটি নির্যাতন ক্যাম্প ছিল। মতিউর রহমান মতি ওরফে মইত্যা গুন্ডা এই ডালিম হোটেলটি দখলে নিয়ে তার সাথে আরো কতিপয় রাজাকার এবং কিছু বিহারী ছেলেকে নিয়ে এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনা করতো ও সাধারণ মানুষ জনকে ধরে এনে নির্যাতন করতো। এই মতি গুন্ডাকে আমি চিনতাম সে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহের টিকেট কালোবাজারী করতো... কথাগুলো অসত্য।
ইহা আমি জানিওনা এবং শুনিওনি যে, মীর কাশেম আলী সাহেব ইসলামী ছাত্র সংঘের চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন কিনা বা তিনি আল-বদরের সংগে সম্পৃক্ত ছিলেন কিনা বা ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা কর্মীরাই আল-বদর বাহিনীর সদস্য ছিল কিনা।
ইহা সত্য নয় যে, ডালিম হোটেলে নির্যাতন এবং কর্মকান্ডের সাথে মীর কাশেম আলী সাহেব জড়িত ছিলেন মর্মে আমি কখনও কিছু শুনিনি মর্মে জবানবন্দীতে যে কথাগুলো বলেছি তা অসত্য।
আমি ২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরেই ছিলাম। পাকিস্তান সেনারা চট্টগ্রাম দখলে নেওয়ার পর শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন নবী চৌধুরী, শান্তি কমিটির সংগে মুসলিম লীগ ছিল, জামায়াতে ইসলামী ছিল কিনা তা আমি জানি না। ইহা আমার জানা নেই যে, চট্টগ্রাম রাজাকার বাহিনী, আল-বদর বাহিনী বা আল-শামস বাহিনী ছিল কিনা। আমি ট্রেনিং থেকে ফিরে এসে শুনেছি গুডস হিলে একটি নির্যাতন ক্যাম্প ছিল, তবে দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিংয়ে নির্যাতন ক্যাম্প ছিল কিনা বলতে পারবো না। ইহা আমি শুনেছি যে, পাহাড়তলীতে একটি বধ্যভূমি ছিল এবং সেখানে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করে ফেলে রাখা হতো। ইহা আমার জানা নেই যে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস সদস্যরা মানুষ হত্যা করে কর্ণফূলী নদীতে ফেলে দিতেন কিনা, আমি চট্টগ্রাম রেলওয়ে ষ্টেশন গোডাউন চিনতাম, তবে এটি নির্যতান কেন্দ্র ছিল কিনা তা আমি জানি না বা সেখানে পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্প ছিল কিনা তাও জানি না। আমার বাড়ী থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে ষ্টেশন গোডাউন ২০০ মিটার দূরে। ইহা সত্য যে, ১৯৭১ সালে আমার বাসা থেকে রেল ষ্টেশনে যেতে হলে গোডাউনটি পার হয়ে যেতে হতো। মুক্তিযোদ্ধা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি মাঝে মধ্যে রেলওয়ে ষ্টেশনে আসতাম।
ইহা সত্য নয় যে, আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে যাইনি বা স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল-বদরদের সমর্থক হিসেবে তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মুক্তিযোদ্ধা সেজে ভারতে গিয়েছিলাম, মুক্তিবার্তায় কখনও আমার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম প্রকাশিত হয়নি। আমার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট আছে।
ইহা সত্য যে, আমি বর্তমানে চট্টগ্রাম মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাথে জড়িত নই, ইহা সত্য নয় যে, আমি আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে আসামী পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মীর কাশেম আলী সাহেবকে রক্ষা করার জন্য সত্য গোপন করে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম।
টু কোর্টঃ ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে মীর কাশেম আলী সাহেবকে আমি চিনি। তিনি ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা (পরিচালক) ছিলেন। ২৪ নভেম্বর, ১৯৭১ তারিখে আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছানোর পথে বাশবাড়িয়া (সিতাকুন্ড) থেকে বাসে উঠি, বাসে উঠার পূর্বে আমার অস্ত্র লিডারদের কাছে রেখে এসেছি, হাটার সময় অস্ত্র আমাদের হাতেই থাকতো।
তৃতীয় সাক্ষীর জবানবন্দি
আমার নাম আবু তাহের খান, পিতা- মৃত আব্দুস ছালাম খান, মাতা- মৃত এজলাস খাতুন। ঠিকানা- ২/২৪ উত্তর হালিশহর, থানা- হালিশহর, জেলা- চট্টগ্রাম। আমার বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। আমি বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করছি। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২০ বছর, ঐ সময় আমি রেলওয়েতে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে স্টোর ক্লার্ক হিসেবে চাকুরী করতাম।
১৯৭১ সালে আমার বাসা ছিল চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে। আমি ইষ্ট পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগ, চট্টগ্রাম এর সদস্য ছিলাম। আমি ৭ মার্চ, ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য রেসকোর্স মাঠে উপস্থিত ছিলাম। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের বেতন ২ মার্চ উত্তোলন করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে আমি আর কাজে যোগ দেইনি।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আমি পটিয়াতে আমার গ্রামের বাড়িতেই ছিলাম। স্থানীয়ভাবে আমরা সাবেক আনসার কমান্ডার কবির আহমেদ মিয়াজির নেতৃত্বে ৩০-৪০ জন যুবক ট্রেনিং গ্রহণ করি। এদের মধ্যে আমিসহ ১০ জন ভারতে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য নির্বাচিত হই। কিন্তু আমি অসুস্থতার কারণে ভারতে যেতে পারিনি। আমার পরিবর্তে আমার ছোট ভাই আবু জাফর খান আমাদের কাউকে না জানিয়ে ঐ গ্রুপের সাথে ভারত চলে যায়। আমি এক দেড় মাস পর সুস্থ হয়ে স্থানীয় সহযোগীদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করতে থাকি।
অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমার চাচাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা সিরু বাঙ্গালী ও ছোট ভাই আবু জাফর খান ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে আসে। সিরু বাঙ্গালী ১৫১ গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন, ছোট ভাই বিএলএফ এর সদস্য ছিলেন। আমি সহ স্থানীয় আরো কিছু যুবক ১৫১ গ্রুপে যোগ দেই এবং স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং নেই। তখন আমি পটিয়াতেই ছিলাম। সিরু বাঙ্গালীর নেতৃত্বে পটিয়া এলাকায় বিভিন্ন অপারেশনে অংশ গ্রহণ করি।
২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ আমার কমান্ডার সিরু বাঙ্গালীর সুপারিশ নিয়ে আমি পুনরায় রেলওয়ের চাকুরীতে যোগদান করি। চাকুরীতে যোগদানের পর শহরের বিভিন্ন এলাকার নির্যাতন কেন্দ্র এবং বধ্যভূমিগুলো পরিদর্শন করি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মীর কাশেম আলী সাহেবের ছেলে ব্যারিস্টার আরমান আমার বাসায় গিয়ে আমাকে বলে, ‘চাচা আমার বাবার বিরুদ্ধে ডালিম হোটেলে নির্যাতন পরিচালনার অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে। আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা আপনি কিছু জানেন কিনা।’ তখন আমি তার প্রত্যুত্তরে বলেছিলাম ‘ডালিম হোটেলটি মতিউর রহমান ও তার সহযোগীরা ১৯৭১ সালে দখলে নিয়ে একটি নির্যাতন ক্যাম্প হিসেবে পরিচালনা করতো। সাধারণ মানুষকে নিয়ে সেখানে নির্যাতন করা হতো। ডালিম হোটেলের মালিক ১৯৭২ সালে কোতয়ালী থানায় একটি মামলাও করেছিল।’ আমি তাকে মামলার খোঁজ খবর নেওয়ার জন্যে পরামর্শ দিয়েছিলাম। তখন সে আমাকে তার বাবার পক্ষে সাক্ষ দিতে অনুরোধ করেছিল। আমি তাকে আরো বলেছিলাম তোমার পিতা ডালিম হোটেলের নির্যাতনের সংগে জড়িত ছিলেন মর্মে কিছু শুনিনি। ২/৩ মাস পর আরমান আমাকে ফোনে বলে ডালিম হোটেলের ঘটনা সংক্রান্তে মামলার কাগজ পেয়েছি। গতকালকে সে কাগজটি আরমান আমাকে দেখতে দেয়। এই সেই জি আর মামলা নং- ৪৯৩/১৯৭২, তারিখ ২১/০১/১৯৭২ সংশ্লিষ্ট ইনফরমেশন স্লিপ তারিখ ০৩/১২/২০১৩ (প্রদর্শনী- অ)। আরমান আমাকে ইতিপূর্বে ডিফেন্স কর্তৃক দাখিলকৃত আরো ৩টি বই দেখিয়েছিল। এই সেই ৩টি বইয়ের একটি ‘প্রামাণ্য দলিল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ বইয়ের ফটোকপি বস্তু প্রদর্শনী- ই (ডিফেন্স ডকুমেন্ট ভলিয়্যুম- ১ এর পৃষ্ঠা ০১-২২৪): দ্বিতীয়টি হলো ‘আনোয়ারা একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ’ বইয়ের ফটোকপি বস্তু প্রদর্শনী- ঈ (ডিফেন্স ডকুমেন্ট ভলিয়্যুম- ১ এর পৃষ্ঠা ২২৫-৩৪৫): তৃতীয়টি হলো ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা’ বইয়ের ফটোকপি বস্তু প্রদর্শনী- উ (ডিফেন্স ডকুমেন্ট ভলিয়্যুম- ১ এর পৃষ্ঠা ৩৪৬-৪১২)।
তৃতীয় সাক্ষীর জেরার উল্লেখযোগ্য অংশ
জেরার জবাবে সাক্ষী বলেন, আমি ১৯৬৭/৬৮ সালে কর্তালা বেলখাইন মহাবোধী হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করেছি। কর্তালা পটিয়া থানার অন্তর্গত। আমি ১৯৮১ সালে এম.ই.এস কলেজের নাইট শিপ্টের ছাত্র হিসেবে এইচ.এস.সি এবং ১৯৮৩ সালে বি.এ পাশ করি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, আমি ইষ্ট পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগ পাহাড়তলী শাখা কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলাম। ইহা সত্য নয় যে, এই এমপ্লয়ীজ লীগে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরাও সদস্য ছিল। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও বামপন্থি দলের সমর্থকরাই এই শ্রমিক সংগঠনের সদস্য ছিল। ইহা সত্য যে, আমি এস.এস.সি পাশের যোগ্যতা নিয়ে চাকুরীতে যোগদান করি। ইহা সত্য নয় যে, ১৯৭০-৭১ সালে উক্ত এমপ্লয়ীজ লীগে আবু তাহের খান ও আরকান আলী সম্পর্কে একটি গ্রুপ এবং ওবায়দুল হক ও এনায়েত হক সমন্বয়ে আরেকটি গ্রুপ ছিল। আমি ১৯৮৩ সালে আবু তাহের খান ও আরকান আলী সমন্বয়ে যে গ্রুপটি ছিল তার জেনারেল সেক্রেটারী ছিলাম। ইহা সত্য নয় যে, এই গ্রুপটি জামায়াত সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল। আমি ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে বিয়ে করেছি, আমার ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে যারা আওয়ামী লীগ করতো তাদের নাম বলতে পারবো না।
মুসলিম লীগ সকল গ্রুপ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী প্রভৃতি দলের নেতাদের নাম বলতে পারবো না। তখন ছাত্রলীগ ছাড়া ইসলামী ছাত্রসংঘসহ অন্য কোন ছাত্র সংগঠনের নেতা কারা ছিলেন তাদের নাম বলতে পারবো না বা তাদের কারো সংগে আমার পরিচয় ছিল না।
ইহা সত্য যে, মীর কাশেম আলী সাহেবের সংগে আমার পারিবারিক সম্পর্ক নেই। মীর কাশেম আলী সাহেবকে আমি প্রথম চিনি এবং তার নাম শুনি ১৯৮৩ সালের পর, যখন তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। আমি যে শ্রমিক সংগঠনটির সংগে সম্পৃক্ত ছিলাম তার পক্ষ থেকে প্রকাশিত স্মরনিকায় ইসলামী ব্যাংকের বিজ্ঞাপন আনার জন্য ওনার সংগে ঢাকায় দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেপ্টেম্বর ২০১৩ এর পূর্বে আমি কখনও মীর কাশেম আলী সাহেবের ছেলে ব্যারিষ্টার আরমানকে দেখিনি। সেপ্টেম্বরের কত তারিখে আরমান আমার বাসায় আসে তা মনে নেই। তবে সম্ভবত মাসের শেষের দিকে কোন এক দুপুরে আমার হালি শহরস্থ ভাড়া বাসায় এসেছিল। ব্যারিস্টার আরমান হঠাৎ করেই সেদিন আমার বাসায় এসেছিল। সে কার কাছ থেকে আমার বাসার ঠিকানা এবং আমার পরিচয় নিয়ে এসেছে তা সে বলেনি। ১৯৭২ সালের রুজুকৃত ডালিম হোটেল সম্পর্কিত মামলার বিষয় বস্তুর ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই, প্রদর্শনী- অ তে ডালিম হোটেলটিতে শুধু মামলার নম্বর ছিল। আমি এটি ভালভাবে পড়ে দেখিনি।
ইহা আমার জানা নাই যে, ৩০ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান আর্মিরা চট্টগ্রাম এর ডিসি হিল দখল করার পর মহামায়া ডালিম হোটেলের মালিক চন্দ্র মোহন নাথ এই হোটেল ভবনটির দেখাশুনার দায়িত্ব তার দুজন কর্মচারীকে দিয়ে গিয়েছিল কিনা। ইহা সত্য নয় যে, জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত হোটেল ভবনটি কখনও মীর কাশেম আলীর নিয়ন্ত্রণাধীন আল-বদরের টর্চার ক্যাম্প ছিল বা মীর কাশেম আলী আল-বদরের কমান্ডার ছিল। ইহা সত্য নয় যে, ১৯৭১ সালে ডালিম হোটেলে আল-বদর, আল-শামস সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের এনে নির্যাতন করে হত্যা করতো। আজকে ট্রাইব্যুনাল আমার কর্তৃক প্রদর্শনী বইগুলো আমি কখনও পড়ে দেখিনি।
১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম পিস কমিটি গঠন করা হয়েছিল, ঐ কমিটিতে মুসলিম লীগের লোকেরাই ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা ছিলেন এ কথা আমি শুনিনি। আমি অধ্যাপক গোলাম আযমের নাম শুনেছি। ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে পিস কমিটি হয়েছিল। সে কমিটিতে গোলাম আযম সাহেব ছিলেন কিনা আমি জানি না।
ইহা সত্য যে, ১৯৭১ সালে গোলাম আযম সাহেব জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন। কেন্দ্রীয় পিস কমিটিতে মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি, নেজামে ইসলাম দলগুলো এবং তার নেতারা ছিলেন কিনা তা আমার জানা নেই। আমি ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ স্বাধীনতার পর প্রথম চট্টগ্রামে আসি। ইহা সত্য যে, চট্টগ্রাম শহরে পিস কমিটির পাশাপাশি রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী ছিল।
আমি জানি না যে, চট্টগ্রাম শহরে গুডস হিল, সার্কিট হাউজ, ষ্টেডিয়াম, দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, ডালিম হোটেল ভবন প্রভৃতি স্থানে পাকিস্তানী আর্মি, আল-বদর, আল-শামস, রাজাকারদের নির্যাতন ক্যাম্প ছিল কিনা। পটিয়া প্রপারে পিস কমিটি হয়েছিল। পটিয়াতে পিস কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর নেতৃত্বে কারা ছিল তা আমি জানি না। আনোয়ারায় আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার হাফেজ মকবুল আহমেদ ছিল কিনা আমি জানি না। আমি জানি না যে, এই হাফেজ মকবুল আহমেদ এবং মীর কাশেম আলী পাকিস্তান প্রতিরক্ষা দিবসে সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামে মিছিল করেছিল কিনা বা তার সচিত্র প্রতিবেদন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কিনা।
ইহা সত্য নয় যে, আমি মূলত জামায়াত কর্মী ছিলাম বা ছদ্মবেশে শ্রমিক সংগঠনের সংগে জড়িত হয়ে জামায়াতের পক্ষে কাজ করতাম বা পাকিস্তানীদের দোসর হিসেবে ছদ্মবেশে সিরু বাঙ্গালীর নেতৃত্বে গেরিলা ইউনিটে যোগ দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষেই কাজ করতাম। ইহা সত্য নয় যে, আমি জামায়াতের রাজনীতির সংগে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ইহা সত্য নয় যে, আমি একজন জামায়াত কর্মী হিসেবে জামায়াত সমর্থিত রেল শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালক অভিযুক্ত মীর কাশেম আলীর কাছে স্মরণিকাটির প্রকাশের জন্য বিজ্ঞাপন নিতে এসেছিলাম। ইহা সত্য নয় যে, এই মামলায় মীর কাশেম আলী সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের অনেক পূর্ব থেকেই তার সংগে আমার যোগাযোগ ছিল এবং তার কাছ থেকে বিভিন্নভাবে আর্থিক লাভবান হয়েছি।
ইহা সত্য নয় যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে মীর কাশেম আলী সাহেবের পক্ষে সত্য গোপন করে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম।
টু কোর্টঃ মতিউর রহমান ওরফে মইত্যা গুন্ডাকে আমি কখনও দেখিনি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি তার নাম শুনেছি।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=144422