২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ
৮ এপ্রিল ২০১৪, মঙ্গলবার,

কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আ ত ম শাহিদুজ্জামান নাসিম। তিনি  মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী। গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার পর সাক্ষীকে আংশিক জেরা করেন ডিফেন্স আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। আজ মঙ্গলবার পুনরায় সাক্ষীকে জেরা করার দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল-২।
সাক্ষীর জবানবন্দী : মাওলানা আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে  প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে তার মামা মোয়াজ্জেম হোসেন, দুলাভাই মতলেব আহমেদ খান, ভাগ্নে নাজমুল হক খান হেলালসহ অনেককে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দেন।  সাক্ষ্য গ্রহণে ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন এবং রেজিয়া সুলতানা চমন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন মাওলানা আব্দুস সুবহানের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষী আ ত ম শাহিদুজ্জামান নাসিম বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনারা পাবনা জেলার পুলিশ লাইনে আক্রমণ করে। এরপর সাধারণ জনগণ ও পুলিশের প্রতিরোধের মুখে ২৯ মার্চ পাকিস্তানী সেনারা পাবনার মাধবপুর এলাকা দিয়ে পালাতে শুরু করে। ওই সময় তারা প্রায় ১৮ জনকে হত্যা করে এবং অনেক বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়।
সাক্ষী জানান, ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল পাকিস্তানী সেনারা নগরবাড়ী হয়ে পাবনার দিকে এগোতে থাকে। বিকেলে তারা দাসুরিয়া হয়ে ঈশ্বরদীতে চলে আসে। সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা পাকিস্তানী সেনাদের প্রতিরোধ করতে না পেরে প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সাক্ষী জানান, তিনি স্থানীয় এসএম স্কুলের পেছনে একটি জটলার মধ্যে আত্মগোপন করেন। এরপর পাকিস্তানী সেনারা চলে গেলে ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আশ্রয় নেন। তখন সেখানে তিনি আরো দুইশ’ মানুষকে আশ্রয় নিতে দেখেছেন। এর মধ্যে তার মামা মোয়াজ্জেম হোসেন, ভগ্নিপতি মতলেব আহমেদ খান, ভাগ্নে নাজমুল হক খান হেলাল, রফিক পাটোয়ারী, জসিম উদ্দিন, জয়নাল আবেদিনসহ আরো অনেককে দেখতে পান।
শহিদুজ্জামান ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিলের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, পরদিন (১২ এপ্রিল) দুপুর বেলা মসজিদের ইমাম সাহেব ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানী সৈন্য ও পাকিস্তানের নেতারা আসবেন। আপনারা সবাই ঈমান শক্ত করে কথা বলবেন। মসজিদের পাশে একটি টিনসেডের পরিত্যক্ত দোকানে বসে বিহারিরা মসজিদের মুসল্লিদের ওপর নজরদারি করতো উল্লেখ করে সাক্ষী বলেন, এ কথা শোনার পর আমার দুলাভাই বললেন, তুমি এখান থেকে চলে যাও। তিনি আমাকে দু’টি রুটি ও একটি চাদর দিলেন। আমি চাদর গায়ে জড়িয়ে ফজরের নামাজের পর আমার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। দুপুরের মধ্যে বাড়িতে পৌঁছে যাই।
বাড়িতে পৌঁছার পর পারিবারিক চাপে ১৭ এপ্রিল দুলাভাই ও ভাগ্নেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে যান উল্লেখ করে সাক্ষী শহিদুজ্জামান বলেন, আমি মসজিদ থেকে ১০০ ফুট দূরে জঙ্গলে অবস্থান করে দেখতে চাইলাম কি হয়? কিছুক্ষণ পর দেখি, মাওলানা সুবহান এবং তার সঙ্গে থাকা জামায়াত সদস্য খোদা বকস, ইসমাইল, আবদুল হামিদ ওরফে হারেস উদ্দিন, ইসহাক আলী, আব্দুর রকিব মসজিদে ঢুকে মামা মোয়াজ্জেম হোসেনকে টেনে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন। তাদের সবার হাতেই ৩০৩ রাইফেল ছিল।
সুবহান তার সঙ্গীদের নিয়ে মসজিদের পাশে পরিত্যক্ত টিনশেডের দোকানটিতে এলেন। সঙ্গী হারেস উদ্দিন একটি তোয়ালে দিলে তিনি হাত, মুখ মুছে মাথায় টুপি দিলেন। এ অবস্থার পর বাড়ি ফিরে ঘটনা বললে বাবা-মা কান্নাকাটি শুরু করেন। বলেন, তুমি যেভাবে পারো ওদের নিয়ে আসো। সাক্ষী বলেন, পরদিন ১৮ এপ্রিল আবার গেলাম তাদেরকে নিয়ে আসতে। মসজিদের কাছাকাছি যাওয়ার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে দেখি, একই কায়দায় সুবহানসহ তার দলবল আমার দুলাভাই মোতলেব আহমেদ খান ও ভাগ্নে হেলালকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসেন। এরপর সেই একই কায়দায় সুবহান প্রথম আমার দুলাভাই মতলেব আহমেদ খানকে আঘাত করেন। এরপর তার সহযোগীদের এলোপাতাড়ি কোপে দুলাভাই মতলেব খান ও ভাগ্নে নাজমুল হক খান হেলাল শহীদ হন। শহিদুজ্জামান জানান, ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন কয়লার ডিপোর পাশে ১৯ জন শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে। তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন বলেও জানান।
গত ১ এপ্রিল আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন। গত ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করেন। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে মাওলানা আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে তদন্ত  শুরু হয়। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেন সংস্থা। তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও  মো. নূর হোসাইন এ মামলার তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেন। তদন্তের স্বার্থে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সেফহোমে নিয়ে  মাওলানা সুবহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সংস্থা। ৯টি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা ও জব্দ তালিকার সাক্ষীসহ মোট ৪৩ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
 ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকালে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে  মাওলানা সুবহানকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই রাতেই তাকে পাবনা কারাগারে নেওয়া হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আবদুস সুবহানকে আটক দেখানোর আদেশ চান আদালতের কাছে। ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয় সুবহানকে।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=143070