৮ জুলাই ২০২০, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে ১১ তম সাক্ষীর জবানবন্দী ডিফেন্সে পক্ষের জেরা আজ
৯ জুন ২০১৪, সোমবার,
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে  আমীর মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের এগারোতম সাক্ষী ফজলুর রহমানের  জবানবন্দী গত রোববার গ্রহণ করা  হয়েছে। আজ  সোমবার এই সাক্ষীকে জেরা করার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল সাক্ষীকে আংশিক জেরা করেন ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম।
জেরার জবাবে সাক্ষী বলেন, আমজাদ হোসেন (এম এন এ) এর শূন্য পদে মওলানা সুবহানকে ১৯৭১ সালে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এই আমজাদ হোসেন সাহেব বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারে যোগদানের জন্য পাক সরকার তাকে ১০ বছর কারাদ- দেয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী আরো বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেই আমি একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে জেলখানায় ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে বর্ণিত মামলাটি ছিল একটি হত্যা মামলা। যে লোকটি মারা গিয়েছিল তার নাম নবাব আলী। গতকাল ডিফেন্স  পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মোঃ মিজানুল ইসলাম, এস এম শাহজাহান কবির, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, আসাদুল ইসলাম। প্রসিকিউসন পক্ষে ছিলেন সুলতান মাহমুদ সিমন ও রিজিয়া সুলতানা।
সাক্ষীর  জবানবন্দী (সংক্ষিপ্ত)
আমার নাম মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু। আমার বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ২১ বছর। আমি ঠিকাদারী ব্যবসা করি এবং একটি স্থানীয় পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। আমি ১৯৬৯ সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ঈশ্বরদী এসএম হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করি। স্থানীয় একটি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে মারামারির কারণে আমি কারারুদ্ধ হই।
 জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ ঢাকাসহ সারা  দেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্রাকডাউন শুরু হলে রাজশাহীতেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আমি তখন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলাম। ২৬ মার্চ সকালে কারা অভ্যন্তরের সকল বন্দী জেলখানা ভেঙ্গে  বেরিয়ে আসলে  আমীর তাদের সাথে জেলখানা থেকে বের হয়ে আমি আমার গ্রামের বাড়ি ঈশ্বরদীতে চলে আসি। ২৯ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে পাবনা থেকে আগত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল পাবনা সদরের মাতপুর নামক স্থানে পৌঁছলে স্থানীয় ১০-১২ হাজার জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং গোলাগুলীর এক পর্যায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছে থাকা মেশিন গান দিয়ে নির্বিচারে গুলী বর্ষণ করে এতে স্থানীয় আনুমানিক ৫০ জন স্বাধীনতাকামী জনতা নিহত হয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীরও ৩/৪ জন সদস্য নিহত হয়। ২৯ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ পর্যন্ত সমগ্র ঈশ্বরদী এলাকাটি সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
১১ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখ সকাল ১০ নাগাদ আমরা খবর পাই যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি বড় দল ভারী অস্ত্র সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নগরবাড়ী থেকে পাবনা হয়ে ঈশ্বরদীর দিকে অগ্রসর হয় এবং বিকাল ৩/৪ টা নাগাদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমগ্র ঈশ্বরদী দখল করে নেয়। ঈশ্বরদী বিমান বন্দর,ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, আলহাজ্ব টেক্সটাইল মিল, ঈশ্বরদী ডাক বাংলো, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে। এ সময় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং বিহারীরা সাদা পতাকা নিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের আগমনকে স্বাগত জানায়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আগমনের ঐ দিনই (১১ এপ্রিল) স্থানীয় জামায়াত নেতা খোদা বক্স খান, ইসমাইল মাওলানা, হারেজ উদ্দিন, সিদ্দিক, আব্দুল কাদের, এ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম, তাসলিম আলমসহ মুসলিম লীগ, ভুট্টোর পিপলস পার্টি এবং বিহারীরা পাকিস্তানী সেনা সদস্যদেরকে নিয়ে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ২০০ লোককে হত্যা করে, যাদের মধ্যে ২/৩ বছরের শিশুরাও ছিল। স্থানীয় আনুমানিক ২০০ জন মানুষ মৃত্যু আতংকে ভীত হয়ে ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদটিকে তাদের নিরাপদ আশ্রয় স্থল মনে করে  সেখানে আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে মোয়াজ্জেম হোসেন, মতলেব আহমদ খান, নাজমুল হক, নাসিম, জয়নাল আবেদিন, বারী চৌধুরী, আজাহার চৌধুরী, বাবর আলী সরদার প্রমুখ ছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল আনুমানিক সন্ধ্যার দিকে মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে তহুরুল ইসলাম আমাকে বলে তার পিতা ঈশ্বরদী জামে মসজিদে আটক অবস্থায় আছে। তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার জন্য আমাকে অনুরোধ করে। ১৭ এপ্রিল আনুমানিক দুপুর ২টা আড়াইটা নাগাদ আমি এবং তহুরুল তিলকপুর গ্রাম থেকে ঈশ্বরদী জামে মসজিদের পিছনে তহুরুল আলমের ফুপুর বাড়ির ভিতরে আসি।
আমাদেরকে দেখে তহুরুলের ফুপু আতংকিত হয়ে পড়ে এবং দ্রুত বাড়ি ত্যাগ করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেয়। তখন আমরা ফুপুর বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে মসজিদের কাছে একটি জঙ্গলে নিজেদেরকে আড়াল করে বসি। সেখান থেকে দেখতে পাই পাবনার দিক থেকে একটি সাদা কার মসজিদের পাশে অবস্থিত জামায়াতে ইসলামীর টর্চার সেলের সামনে এসে থামে। ঐ গাড়ি থেকে মাওলানা সুবহানসহ ৩/৪ জন নামলে অফিসে অবস্থানরত খোদাবক্স সহ আরো কিছু লোক তাদেরকে অভ্যর্থনা জানায়। এ সময় তারা সবাই সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। খোদা বক্সসহ অন্যান্য লোকদের সাথে মাওলানা সুবহান কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে অন্যদেরকে নিয়ে ঈশ্বরদী জামে মসজিদে প্রবেশ করে এবং আসরের নামাজ আদায় করে। নামাজ আদায়  শেষে তহুরুলের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেনকে মাওলানা সুবহান এবং তার সাথে থাকা জামায়াতে ইসলামীর কিছু লোক টানা হেঁচড়া করে মসজিদ থেকে বের করে কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যায়। কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যাবার পর আমরা দেখতে পাই যে, জামায়াতের একজন সদস্য একটি তলোয়ার জাতীয় ছোরা মাওলানা সুবহানের হাতে দেয়। মাওলানা সুবহান সেই তলোয়ারটি দিয়ে প্রথমে মোয়াজ্জেম হোসেনকে আঘাত করে সেই আঘাতে মোয়াজ্জেম হোসেন আল্লাহু আকবার বলে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন সুবহানের সাথে থাকা সংগীরা তাদের হাতে থাকা ছোরা, তলোয়ার দিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেনকে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। তখন আমার সাথে থাকা মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে তহুরুল চিৎকার করতে চাইলে আমি তার মুখ চেপে ধরি এবং বলি এ সময় তারা চিৎকারের শব্দ শুনতে  পেলে আমাদের দুজনকেও মেরে ফেলবে। এরপর আমি এবং তহুরুল তিলকপুর গ্রাম আমাদের আশ্রয় স্থলে ফিরে যাই।
এই ঘটনা দেখার পর আমরা দুজন গ্রামের ভিতরের পথ ধরে ধুলটি নামক স্থানে এসে পৌঁছি। সেখানে মতলেব আহমেদের শ্যালক শহিদুজ্জামান নাসিম (পি-ডব্লিউ-১) এর সংগে দেখা হয়। সে তখন তার ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার হত্যাকা-ের সংবাদটি আমাদেরকে জানায়। আমরা তখন তাকে জানাই যে, আমরা নিজেরাই এই ঘটনাটি দেখেছি। শহিদুজ্জামান কান্নাকাটি করছিল। আমরা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম এভাবে কিছু করা যাবে না। আমাদেরকে ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করে এই রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে হবে। তারপর বিভিন্ন বর্ডার দিয়ে ভারতে যাই এবং মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।
অভিযুক্ত মাওলানা সুবহানকে আমি পূর্ব থেকেই চিনি। তিনি জামায়াতে ইসলামীর বিশাল নেতা ছিলেন। পাবনা জেলা জামায়াতের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে শান্তি কমিটি গঠিত হলে তিনি পাবনা জেলা শান্তি কমিটির সেক্রেটারি হন। পরে তিনি শান্তি কমিটির সহ-সভাপতিও হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যরা স্বাধীন বাংলা সরকারে যোগ দিলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঐ সকল সদস্যদের পদ শূন্য ঘোষণা করেন। তারই একটি শূন্য পদে পাবনা থেকে তিনি ১৯৭১ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এম এন এ নির্বাচিত হন।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=148544