২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পরাজয় ও মোদি যুগে প্রবেশ
৩০ মে ২০১৪, শুক্রবার,
|| ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম || আমেরিকার রাষ্ট্রনায়ক এ গুরু জনসনকে একসময়ে একজন ঠাট্টা করে বলেছিল-দেশমান্য রাষ্ট্রনায়ক হলেও আপনি এককালে দর্জি ছিলেন। নায়ক সে কথায় লজ্জিত না হয়ে বললেন- দর্জি ছিলাম, কিন্তু সবসময় ঠিক কাজ করেছি, কোনোদিন কাকেও ঠকাইনি। নিউটন চাষার ছেলে। মিলটনের বাবা পোদ্দার। জর্জ স্টিফেনশন ছিলেন কয়লাওয়ালা। শেক্সপিয়ার একজন ছোটলোকের ছেলে। এই সবতো সকলেরই জানা। ফকস যখন-ই বক্তৃতা দিতে উঠতেন, তখন প্রত্যেকবারই এই কথা বলে আরম্ভ করতেন-“যখন নরউইচ শহরে তাঁতের কলের চাকর আমি ছিলাম।” চা বিক্রেতা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে সে পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করলেন মোদি। ভারত এখন মোদি যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের সর্বাপেক্ষা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই রাষ্ট্র নায়কের চিন্তা-চেনতা, বিশ্বাস, উপলব্ধি, স্বভাব-চরিত্র এখন খুব সামনের থেকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই দিক থেকে নরেন্দ্র মোদির পরিশ্রম, সাধনা, কর্মের পরিধি তার আজকের এই অর্জনের কারিগর হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। মোদির কর্মসূচিতে ভারতের ৩০০ মিলিয়ন মধ্যবিত্ত মানুষের আকাক্সক্ষা জড়িত। তার দায়িত্ব অনেক-কঠিন ও বিস্তৃত। তার দায়িত্বেও অন্যতম হলো অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ। তার নেতৃত্বে গুজরাটের অর্থনীতি ২০০১ সালের পর আকারে তিনগুণ বেড়েছে। কিন্তু গোটা ভারতবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে মোদি এবং তার ৪৫ মন্ত্রিসভা কতটুকু সফল হবেন তা ভবিষ্যৎ-ই নির্ধারণ করবে। বলা হয়ে থাকে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অপরিসীম। কাজ করিয়ে নিতে ও বিনিয়োগ আনতেও তিনি পারঙ্গম। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতাও মোদির কম নয়। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতাকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে পারেন এই নেতা। অচল ও ঝামেলাপূর্ণ বিষয় সমাধানে তিনি ক্ষমতা রাখেন। আবার আশংকার দিক হলো গুজরাট  তার হিং¯্রতা ও অমানবিকতার ইতিহাস বডই জঘন্য। কিন্তু এটি যদি তার অনুশোচনার অংশ হয়, তাহলে ভাবা যায় তার দায়িত্বেও বড়ত্ব দিয়ে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে পারবেন কিনা তা সময়ই বলে দেবে। মোদি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বিরোধী মত ও  সার্ক নেতাদের উপস্থিতি আঞ্চলিক সহযোগিতারই ইঈিত বহন করে মনে করছেন বিজ্ঞজনরা। কিন্তু দেশে-বিদেশে মোদির বিরুদ্ধে দাঙ্গার যে অভিযোগ আছে সেই পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে।
২০০২ সালে  গুজরাটের  সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুই হাজার মুসলমানের মৃত্যুবরণ আর প্রায় দুই লাখ মুসলমানের ঘরছাড়ার কালো দাগ তার কপালে। মহিলাদের ধর্ষণ, পুরুষদের কেটে টুকরো টুকরো করা এবং কেরোসিন দিয়ে বা জ্বলন্ত টায়ারে পুড়িয়ে মারার নেপথ্য নায়ক কে? অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পেট চিরে তাদের চোখের সামনে ভ্রুণ হত্যা করার অমানবিক ইতিহাস মোদির গুজরাটেই সংঘটিত হয়েছে। মোদি নিজে প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে গর্ব করলেও তার বিরুদ্ধে ২০০২ সালের দাঙ্গা সংঘটিত হতে দেয়ার অভিযোগ আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মোদির প্রশাসন এই হত্যাযজ্ঞে সহযোিগতা করেছে। ‘এটা ছিল পরিকল্পিত আক্রমণ’। ওই প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক বলেছেন, ‘এটা সংঘটিত হয়েছে পুলিশ ও রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়’ মোদি তদন্তের মুখোমুখি হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো রায় হয়নি। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাদানে তিনি ব্যর্থ হলেও  কখনোই ক্ষমা প্রার্থনা করেননি বা তার মধ্যে কোনো অনুশোচনাও দেখা যায়নি। দাঙ্গা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও গত বছর তিনি মন্তব্যে করেন, ‘একটি কুকুরছানা গাড়িচাপা পড়লে’ আমি যেমন দুঃখিত হতাম, দাঙ্গায় মুসলমানদের দুর্দশায় ঠিক তেমন কষ্ট পেয়েছি। একবার তিনি দাঙ্গাবাজদের কর্মকা-কে আংশিকভাবে যৌক্তিকও বলেছিলেন। যেমন বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘নয় এগারো পরবর্তীকালে নিরপরাধ শিখ নিহত হয়েছিল, কেন? কারণ সে দেখতে সন্ত্রাসীদের মতো ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষিত মানুষদের যদি উস্কানি দিয়ে এ কাজ করানো সম্ভব হয়, তাহলে গুজরাটের মানুষদের ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন মাপকাঠি ব্যবহার করা হবে?’ আরও একবার এর চেয়েও শীতল কণ্ঠে তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন : ‘কেন ২০০২ সাল নিয়ে এত কথা হচ্ছে?... এটা অতীত, এর কী তাৎপর্য আছে?’ নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেছিলেন, তার একমাত্র আক্ষেপ হচ্ছে, তিনি মিডিয়াকে সামলাতে পারেননি”।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনে ধর্ম আবার বিজয় হলো। যদিও কেউ কেউ মনে করে থাকেন এখানে হিন্দুত্ববাদ তথা ধর্মীয় চেতনা আর উগ্রবাদের উন্মেষ ঘটেছে। আর ভরাডুবি হয়েছে ধর্মরিপেক্ষতাবাদের। কারণ বিশ্ব এখন পশ্চিমাবলয়ের বাইরে ছুটে চলেছে। ধর্মীয় ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো তার স্থান দখল করে চলেছে মূল চরিত্র নিয়ে। ওয়েস্টফালিয়ন (ডবংঃঢ়যধষরধ) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ধর্মনিরপেক্ষ করার অর্থাৎ রাজনীতি থেকে ধর্মকে বাদ দেয়ার প্রচেষ্টা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়ছে। এডওয়ার্ড মরটিমার সেই বিষয়টি বিশ্ববাসীকে হিসাব কষে দেখিয়েছেন যে, ধর্ম ক্রমাগত আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ওপর কর্তৃত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধি করছে। ‘ মোদি-ঝড়’ কাঁপাচ্ছে পুরো ভারতকে। দিল্লী শাহী মসজিদের ইমাম সৈয়দ আহমদ বুখারি কংগ্রেসকে ভোট দিতে প্রকাশ্যে মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানালেও তা তেমন কাজে আসেনি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সব ভয় উপেক্ষা করে মুসলমানরাও মোদিকেই বেছে নিয়েছেন নেতা হিসেবে। মুসলিম ভোটব্যাংকে সুবিধা পাওয়া কংগ্রেস মুসলমানদের স্বার্থে তেমন কিছুই না করায় তারা দলটির প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল। এজন্য সুযোগ বুঝে এবার কংগ্রেসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন মুসলিম সম্প্রদায়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ৮১ কোটি ভোটারের এই দেশে ৫৪৩ আসনের পার্লামেন্টে মোট ২৮২টি আসনে জয়ী হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। যারা কট্টরপন্থী ধর্মীয় হিন্দুত্ববাদের ধারক তাদের ভাষায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (৩৪টি) পেয়ে বামপন্থীদের ধরাশায়ী করেছেন। যারা অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তোলেন। তাদের ভ-ামিরও উচিত শিক্ষা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ। আমাদের দেশেও ভোট আসলেই এই বামপন্থী চক্রকে জনগণ হিসেবটা বুঝিয়ে দেয় কড়ায়-গ-ায়। এদেশে ইনু-মেনন সাহেবরা ভাগ-বাটোয়ারার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সাথে যেভাবে জড়িয়ে পড়েছে, তাতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বামপন্থীদের জন্য আরো ভয়াবহ খরা অপেক্ষা করছে। কারণ গলাবাজি করে সব হয় কিন্তু জনসমর্থন আদায় করা যায় না। এ সময়ের মানুষ বড়ই সচেতন। বিশিষ্ট কলামিস্ট ফরহাদ মযহার লিখেছেন-“কংগ্রেস ও ভারতের বামপন্থী দলগুলো সাম্প্রদায়িকতাকে ধর্মনিরপেক্ষতার আলখেল্লা দিয়ে যেভাবে ঢেকে রাখে, তার চেয়ে খোলামেলা হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি অনেক অনেক ভালো। কপট হিন্দুত্ববাদিতার চেয়ে অকপট ও স্বচ্ছ হিন্দুত্ববাদ মোকাবিলা করা সহজ। পাশ্চাত্যের মিথ, নানাবিধ উৎকল্পনা এবং তার সঙ্গে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের প্রচারের কারণে ভারতকে একটি বিশাল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসাবে হাজির করার গালগল্প তো বহু দিনের। কাশ্মীর, পাঞ্জাব বা বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারতের রাজ্যগুলোতে দমন, নিপীড়ন ও রাজনৈতিক বিদ্রোহীদের হত্যার নীতি বহু পুরানা। ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতার আলখেল্লা গায়ে দিলে সেটা আড়াল করা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। বিজেপির বিজয় ও নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভাব হিন্দু ভারতের হিন্দুত্ববাদিতাকে আরো সরল ও স্পষ্ট করেছে। কংগ্রেস ও বামপন্থীদের লুকাছাপা কারবারের চেয়েও হিন্দুত্ববাদী ভারত তার নিজের স্বরূপে হাজির হচ্ছে। একে মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের কপটতার আশ্রয় নিতে হবে না।”
বিজেপি বা মোদি এই অভূতপূর্ব বিজয় আর ঐতিহাসিক দল কংগ্রেসের ব্যাপক পরাজয়ের পেছনে কংগ্রেসের সীমাহীন ব্যর্থতা, কংগ্রেসের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বেকার সমস্যা সমাধান, দুর্বল অর্থনীতি ইত্যাদি কংগ্রেস হারার মোটাদাগের কারণ। তাছাড়া কংগ্রেসের পররাষ্ট্রনীতিকেও অনেকেই দায়ী করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির একতরফা অযাচিত হস্তক্ষেপ বিজিপিও সাধারণ জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। ভারতের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে এত উচ্ছ্বাস আর মনখারাপ কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। বাংলাদেশের বিগত একতরফা নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপে কংগ্রেস কতৃক আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। এক্ষেত্রে কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবারের দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্কই প্রাধান্য পেয়েছে। এজন্য মনমোহন সরকার অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। এতে কংগ্রেস আর আওয়ামী লীগের উপর দু’দেশের জনগণই দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। এর প্রভাব ও ভারতের নির্বাচনে পড়েছে আর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচনেও পড়বে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। আর হয়ত কংগ্রেস থেকে অনেক বেশি খারাপ অবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও হত্যা-গুম-খুন, বিরোধী দল দমন, সন্ত্রাস, নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান এবং বিচার বিভাগকে দলীয়করণের মতো এত ভয়াবহ অভিযোগ নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগের হারাটা মনে হয় কংগ্রেস থেকে আরো অনেক বেশি বেদনাদায়ক হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক মজবুত কাঠামোর মধ্য দিয়ে মোদি আসলেই একজন ক্যারিশমেটিক নেতা হিসাবে নিজেকে হাজির করলেন। তিনি একজন শক্তিমান বক্তা বটে। সম্প্রতি তিনি হয়ে উঠেছেন ব্যাপক জনপ্রিয়। রাজনীতিকদের মধ্যে ফেসবুকে অনুসারীর হিসাবে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে গেছেন নরেন্দ্র মোদি। ফেসবুকের একজন নীতি নির্ধারক এন্ডু স্টোন জানিয়েছেন, গত এক মাসে বিশ্বের যেকোনো রাজনীতিবিদ বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে মোদির ফলোয়ারের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৭ এপ্রিল লোকসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপে মোদির ভক্ত সংখ্যা ছিল এক কোটি ২০ লাখের কিছু বেশি। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন দুই কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারী ফেসবুকে ২২ কোটি ৭০ লাখ পোস্ট, কমেন্ট, শেয়ার এবং  এক কোটি ৩০ লাখ ব্যবহারকারী নরেন্দ্র মোদিকে সাড়ে সাত কোটি অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। (উৎস : নতুন বার্তা) বড় ব্যাপার হচ্ছে দিল্লী-ওয়াশিংটন সম্পর্কে একটা নতুন সমীকরণ ঘটেছে এই নির্বাচনে। কূটনীতিক বহিষ্কার ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে  গুজরাটের গান্ধীনগরে গিয়ে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ন্যান্সি পাওয়েল যেদিন মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, সেদিনই আসলে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ভারতের ক্ষমতায় মোদি আসছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসলে এক্ষেত্রে লুকোছাপা করতে চায়নি। বিজেপিও ওয়াশিংটনের শুভেচ্ছার প্রতি সদিচ্ছা দেখাচ্ছে। ঢাকার পর্যবেক্ষকদের অনেকে এখন স্মরণ করছেন যে, নির্বাচনের আগে সুজাতা সিং-এর বাংলাদেশ সফর এবং বাংলাদেশ ইস্যুতে কংগ্রেস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে যেভাবে নস্যাৎ করেছিল সেটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে ছিল। পরে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেছে বাদবাকি বিশ্ব। কংগ্রেসের ভারত ছাড়া কেউ ‘দ্বিতীয় ঘরে’ নেই! বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস আওয়ামী লীগের ভাগ্য উন্নয়ন করতে গিয়ে নিজেদের মর্যাদাও বিশ্বে কম নষ্ট করেনি। এজন্য ভারতের সব মিডিয়াই কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির সমালোচনা করেছে প্রায় একযোগে। পরিবারিক সম্পর্ক দেশের স্বার্থের উপরে স্থান পেয়ে বসেছে কংগ্রেস সরকারের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল : নিবন্ধে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টির নেতাকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আসামের শিলচর থেকে প্রকাশিত বাংলা দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ গত ১৮ মে-২০১৪ “মোদির জয়ে শেখ হাসিনা সরকারের কপালে ভাঁজ” শিরোনামে এ খবরে বলা হয়- লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বিজেপি জোটের বিপুল বিজয় বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কপালে ভাঁজ ফেলেছে।”
কয়েক ধাপে মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক এই দেশের নির্বাচন। কিন্তু বড় ধরনের কোনো অভিযোগ-বিশৃঙ্খলার খবর ছিল না বললেই চলে। পুরো নির্বাচনই ছিল অবাধ শান্তিপূর্ণ, ও নিরপেক্ষ। নির্বাচনে সহিংসতা, কারচুপি, কেন্দ্রদখল, জালভোট, ব্যালট ছিনতাই, দখলদারিত্বের ঘটনা এখানে ঘটেনি। ক্ষমতায় থেকে নিজেরা ভরাডুবির আভাস পাওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রক্রিয়ায় অবৈধ হস্তক্ষেপ করেনি কংগ্রেস আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মতো। অবশ্য নির্বাচনে সহিংসতা, কারচুপি, কেন্দ্রদখল, জালভোট, ব্যালট ছিনতাই, দখলদারিত্বে আওয়ামী লীগই এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন। এই বড় কৃতিত্ব ভারতের নির্বাচন কমিশনের। ভারত জাতীয় স্বার্থেই নির্বাচন কমিশনন ও বিচার বিভাগকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখেছে। নির্বাচন চলাকালে কমিশন যেকোনো প্রার্থীকে তলব, সতর্ক ও হুঁশিয়ারি দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মোদি ও রাহুলকে পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছে। অথচ এর বিপরীতে আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের কথা ভাবলে রীতিমতো লজ্জিত হতে হয়। আমাদের কমিশন হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ, চাটুকার, হীন, দলীয় ও ব্যর্থ কমিশন। ভারতের নির্বাচনে রাজনৈতিক উদারতাও দৃষ্টি কেড়েছে বিশ্ববাসীর। ভারত যে, পরাশক্তি হতে যাচ্ছে তার নেতৃবৃন্দের আচরণে তার প্রভাব লক্ষণীয়। মোদি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন এমন খবরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মোদিকে ফোনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। অভিনন্দন জানানো হয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও। খোঁজা হয়নি ‘সুক্ষ্ম’ কিংবা ‘স্থূল’, ষড়যন্ত্র আর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। নির্বাচনে নিজেদের ভরাডুবির আভাস পেয়েই কাল-বিলম্ব না করেই কংগ্রেস প্রধান সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরাজয়ের সম্পূর্ণ দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এমনকি মা-ছেলে ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করলেও করতে পারেন বলেও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের দায় নিয়ে ইস্তফা দিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও ওই দলের নেতা নীতিশ কুমার। এই তালিকায় আরো অনেকেই যুক্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে এই রাজনৈতিক কালচার এখনোও গড়ে ওঠেনি। এই ব্যর্থতা আমাদের। এই সংকীনণতা আমাদের নেতৃত্বের। কিন্তু ভারতের নির্বাচন থেকে আমাদের নেতৃবৃন্দ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করবেন কি?
ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে এখানে গণতান্ত্রিক পন্থায় বিজয়ী দল বিজেপিও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আমাদের দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো অভিনন্দন জানিয়েছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর অভিন্দন জানানো ছিল সবচেয়ে আলোচনার বিষয়, এটা নিঃসন্দেহে ভালো দিক। এটা একটা সৌজন্যতা। কারণ কংগ্রেস জামায়াতে ইসলামীকে ভারতের জন্য কথিত হুমকির কাগুজে বাঘ বানিয়ে অত্যন্ত অন্যায়ভাবে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে বিগত ৫ বছর। এটিও দু’দেশের জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। অন্তত মোদির সরকার আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের যোগানদাতা হবে না এটাই ন্যায্য প্রত্যাশা। কিন্তু মোদিকে অভিনন্দনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ক্ষমতায় থাকার আর ক্ষমতায় যাওয়ার মোটেই কাম্য নয়। এটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা হানি করে। গত কয়েকদিন আমরা সেটিই লক্ষ্য করছি। যদি ক্ষমতায় বসানো আর সরানোর মালিকানা দিল্লীর হাতেই হয় তাহলে জনগণের দরকার কি? আর এদেশের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বই বা থাকে কোথায়? মনে রাখতে হবে ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ। আর এদেশের জনগণ যাকে সমর্থন করবে তারাই ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু ভারতকে বাগে নেয়ার রাজনৈতিক বড় দলগুলোর এমন  অসুস্থ প্রতিযোগিতা এদেশের জনগণ দেখতে চায় না। যদিও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট ছাড়াই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে ভারতের কংগ্রেস সেই জঘন্য অন্যায়টি করে ফেলেছে। যা ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাতের শামিল। ভারতে জনগণের সবচেয়ে বেশি ম্যান্ডেট নিয়ে গণতান্তিকভাবে নির্বাচিত দল বিজেপি বাংলাদেশে কোনো অগণতান্ত্রিক দলকে ক্ষমতায় থাকতে সহযোগিতা করবে না (কংগ্রেসের মতো) এটা এদেশের জনগণের প্রত্যাশা। মোদি প্রধানমন্ত্রী শপথের পর তারেক রহমান এবং তার দলকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। এতে মনে হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মোদি পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন আসন্ন। আমাদের মনে রাখতে হবে বিজেপি অবিভক্ত ভারত ও হিন্দুত্ববাদের চেতনায় লালিত একটি দল। সুতরাং আর বিভক্তি নয় এখনই আমাদের সতর্ক হতে হবে। আর এই মুহূর্তে দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় গড়তে হবে জাতীয় ঐক্য। আমরা যদি আমাদের নিজস্ব শক্তি আর সম্ভাবনার দ্বারকে উন্মুক্ত করে বিশ্বের দরবারে  মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি, তাহলে সবাই আমাদের কাছে আসতে বাধ্য হবে। এই দেশে অযুত সম্ভাবনা লুকায়িত। আমরা কারো করুণা চাই না। চাই সমতা আর বন্ধুত্বপূর্ণ  ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও আমাদের ন্যায্য অধিকার। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ সেদিকেই মনোযোগী হবেন। গড়ে তুলবেন জাতীয় ঐক্য। আমজনতার এটাই প্রত্যাশা।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=147617