২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
অনিবার্য গন্তব্যে ভারত
২১ মে ২০১৪, বুধবার,
|| ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী || ভারতে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) যে উত্থান সেটি সেখানে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ হয়েছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতিকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছিল। তার উপর সোভিয়েত ইউনিয়নে মার্কসবাদের আদর্শে ১৯১৭ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েমের পর পৃথিবীর কোটি কোটি তরুণ যুবক সে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম, এমনকি কোথায়ও কোথায়ও সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। ততক্ষণে মাও সে তুং এর নেতৃত্বে চীনেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে। আর তাই এটি ছিল একটি আদর্শ। কোথায়ও কোথায়ও রোমান্টিসিজম।
সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে পৃথিবীতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বুলি খুব একটা চালু ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে কেউ কেউ ধর্মহীনতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ধর্ম নিয়ে নানা ঠাট্টা মশকরাও চালু হয়ে গিয়েছিল। তরুণ সমাজের একাংশ ধর্মচর্চাকে প্রাচীন পন্থা হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিল। কিন্তু তার পরও খোদ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকেও ধর্মচর্চার বিলুপ্তি ঘটেনি। তা আগেও যেমন ছিল, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও একইভাবে ধর্মচর্চা চলেছে। এখনও চলছে। আমারও এরকমই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে বোধহয় কেউ ধর্মচর্চা করে না, কিংবা তা নিষিদ্ধ। কিন্তু ১৯৮৭ সালে চীনে গিয়ে প্রথম আমার সে বিশ্বাস ভাঙলো। ১৯৯১ সালে রাশিয়ায় গিয়ে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলাম। কোনো এক রোববার গিয়েছিলাম এক গীর্জায়, লেনিনগ্রাদে। গিয়ে দেখি, গীর্জার ভেতরে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। চত্বরেও হাজার হাজার মানুষ। সবাই প্রার্থনায় রত। চীনের মানুষ প্রধানত বৌদ্ধ। রাশিয়ায় খ্রিস্টান। এতো বছরের কমিউনিস্ট শাসনের পরও সেখান থেকে ধর্ম অবলুপ্ত হয়নি। ফলে সমাজজীবন বলি, রাজনীতি বলি, এর কোথায়ও থেকে ধর্ম বিলুপ্ত হয়নি। এমনকি নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণা করলেও ভারতে বরং হিন্দুধর্ম প্রবলতর রূপ পেয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। গত ৬৭ বছরেও তাতে কোনো পরিবর্তন আনা যায়নি।
অর্থাৎ ভারতীয় শাসকরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটি ভদ্রতার অনুষঙ্গ হিসেবে দেখে ছিলেন, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখেননি। ভারতে আছে অর্ধশতেরও বেশি জাতিগোষ্ঠী ও ভাষা। এসব জনগোষ্ঠীর রুচি-সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ এমনকি খাদ্যাভ্যাসও ভিন্ন। বহু ধর্মেরও লোক ভারতে বসবাস করে। কিন্তু সেখানকার প্রধান ধর্ম হিন্দুত্ব। ভারতের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ভারতীয় রাজ্যগুলোতে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও আন্দোলন আছে। অনেক রাজ্যই ভারত থেকে স্বাধীন হয়ে যাওয়ার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। তার পরও ভারত যে একটি রাষ্ট্র হিসেবে এখনও টিকে আছে, তার প্রধান কারণ বেশিরভাগ মানুষ সেখানে হিন্দু। এই সাযুজ্য থাকলে ভারত কিছুতেই এতোদিন একটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারতো না। বহু আগেই ভেঙে খান খান হয়ে যেতো। এই বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখা নির্বুদ্ধিতার শামিল।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাও হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতেই। হিন্দুপ্রধান এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছিল ভারত। আর মুসলমানপ্রধান এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছিল পাকিস্তান। মুসলমানপ্রধান পূর্ববাংলা হিন্দু ভারতের সঙ্গে থাকতে চায়, নাকি মুসলমানপ্রধান পাকিস্তানে যোগ দিতে চায় তা নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছিল। সে ভোটে পূর্ববাংলার মানুষ একযোগে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে রায় দিয়েছিল। কারণ হিন্দু শাসনের ওপর তারা আস্থা রাখতে পারেননি। এখন অনেকে অনেক তত্ত্ব ফলান। তারা কার্যত, এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান। কিন্তু সে কাজটি সহজ নয়। সম্ভবত কোনোদিন সহজ হবেও না। ভারত প্রতিষ্ঠার পর সামান্য কিছুকালের ব্যতিক্রম ছাড়া, পুরো সময়টাই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই রাষ্ট্র শাসন করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেখানে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরু। তারপর এসেছিলেন তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরা গান্ধীর পর এসেছিলেন তার পুত্র রাজীব গান্ধী। এবার কংগ্রেস আশা করেছিল, নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হবেন রাজীব গান্ধীর পুত্র রাহুল গান্ধী।
কিন্তু ভারতীয়রা এই দীর্ঘকালের কংগ্রেস শাসনে এতোটাই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, তারা কংগ্রেস বা গান্ধী পরিবারের অমন আশাকে কোনোরূপ মূল্যই দেননি। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস মাত্র ৪৪টিতে জয়লাভ করেছে। কংগ্রেস মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেসব প্রতিশ্রুতি এতোকাল ধরে দিয়েছে, তার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ভারতের দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়েছে। বিত্তবানরা আরও বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছে। এই বিত্ত গড়ে তোলার জন্য কংগ্রেস সরকারের সহায়তায় বিত্তবানরা সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে শোষণই করেছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নিয়েছে। গড়ে উঠেছে মাওবাদী আন্দোলন। তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়। কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য লড়ছে। ভারতের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং একবার বলেছিলেন যে, এই মাওবাদী আন্দোলনই  ভারতের প্রধান সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যা দূর করার জন্য তিনি সমস্যার উৎসের দিকে না গিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা দমন করার চেষ্টা করেছেন। সে চেষ্টায় সফল তো হনই নি, বরং রাজ্যে রাজ্যে মাওবাদী আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে উঠেছে।
কংগ্রেসের শাসকগোষ্ঠী হিসাবটা সেখান থেকে করতে পারতেন। তাহলে বোধকরি, কংগ্রেসের ১০০ বছরের ইতিহাসে তাদের জন্য এতোবড় লজ্জাজনক বিপর্যয় নেমে আসতো না। কংগ্রেসের সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি শুধু যে বাত কে বাত সেটা জনগণ যথাযথভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। সে কারণে ভোটের সুযোগ পেয়ে তারা কংগ্রেসকে একেবারে ধুুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেস এটা উপলব্ধি করেনি যে, সমাজতন্ত্র তরুণসমাজের ভেতরে আগের মতো আর রোমাঞ্চের সৃষ্টি করে না। এর আবেদন সারা পৃথিবীতেই শেষ হয়ে গেছে। এখন চীনে যে সমাজতন্ত্র তাও আসলে পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিকাশ। শুধু একটিমাত্র রাজনৈতিক দল আছে, এটুকুই সেখানে সমাজতন্ত্রের শেষ চিহ্ন। তাতে চীনের জনগণ অখুশি আছে, এমন মনে করার কারণ নেই। কারণ তারা চায় অর্থনৈতিক উন্নতি, জীবন-মানের উন্নয়ন। চীন সরকার সেই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পেরেছে। চীনা সমাজতন্ত্রের সাফল্য মনে হয় এখানেই। ভারতে কংগ্রেসী শাসকরা সাধারণত জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টার ওপর কোনোরকম গুরুত্বই দেননি। ফলে ১২০ কোটি লোকের দেশ ভারতের ৭০ কোটি মানুষ জুতাহীন এবং ঊর্ধ্বাঙ্গে কাপড়হীন অবস্থায় বসবাস করে। তাদের জন্য নেই কোনো স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। এই লোকগুলোর দৈনিক আয় বাংলাদেশী টাকায় ৩০ টাকার মতো। কংগ্রেস শাসনে এদের সংখ্যা খুব একটা কমেনি। বরং কোথায়ও কোথায়ও বেড়েছে।
ভারতে সমাজতন্ত্র এখন একটি বিলুপ্ত স্লোগান। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় তিন দশক ধরে শাসন করেছে সমাজতান্ত্রিক দল সিপিআইএম। তারা পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও অনেক জায়গায় শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছিল। কিন্তু এই আদর্শিক স্লোগান আর কোথায়ও নাড়া দিতে পারছে না। পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার ৪০টি আসনের মধ্যে এবার সিপিআইএম পেয়েছে মাত্র দুটি আসন। সারা ভারতে নয়টি। এক্ষেত্রেও মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আদর্শিক কারণে এই নয়জন জিতে এসেছেন। কার্যত তারা জিতে এসেছেন, তাদের ব্যক্তিত্ব ও ভালোমানুষির জোরে। অর্থাৎ সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এখন জনগণকে নাড়া দেয়ার মতো আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদও নয়, সমাজতন্ত্রও নয়। আর তাই অনিবার্যভাবেই ওসবের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ধর্ম। ধর্ম ছাড়া ভারতকে একীভূত রাখার এই মুহূর্তে আর কোনো উপায় নেই। সে উপলব্ধি বিজেপি নেতাদের যেমন আছে, তেমনি জনগণেরও আছে। আছে বলেই ধর্মত্ববাদী বিজেপিকে তারা এককভাবে ২৮৫ আসনে জিতিয়ে এনেছে। জোটগতভাবে তারা পেয়েছে ৩৪০ আসন। গত ৩০ বছরে ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো।
কংগ্রেসের ভরাডুবির আরও একটি প্রধান কারণ বাংলাদেশ ফ্যাক্টর। ভারতে মুসলমান ভোটারের সংখ্যা ২০ কোটির মতো। তারা বরাবরই কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের হাত থেকে কখনও রেহাই পায়নি। উপরন্তু বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ইসলাম এবং মুসলমান নিধন ও উৎখাতের যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তাতে ঢালাওভাবে মদদ ও উৎসাহ দিয়েছে ভারত। ভারতীয় মুসলমান ভোটারদের দৃষ্টি সেটি এড়িয়ে যায়নি। অর্থাৎ কংগ্রেস নিজ দেশে এবং প্রতিবেশী দেশেও মুসলমানদের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সে কারণে ভারতীয় মুসলমানরা এবার বিপুলভাবে বিজেপিকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি যদি একথা মনে রেখে অগ্রসর হন, তাহলে দীর্ঘকাল ধরে এই সমর্থন তিনি ধরে রাখতে পারবেন। কিন্তু মোদি তার স্বদেশ ও প্রতিবেশী নীতি কীভাবে নির্ধারণ করেন, সেটা এখন দেখার বিষয়।
 http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=146831