১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
কংগ্রেসের ইতিহাসে চরম পরাজয়
১৭ মে ২০১৪, শনিবার,
ভারতে গত ৩০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো দল এককভাবে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেছে। সেই সাথে পড়েছে রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ৬৬ ভাগ ভোট। এর ফলে ভারতের ইতিহাসে চরম পরাজয়ের স্বাদ নিতে হচ্ছে কংগ্রেসকে। ভারতের ঐতিহ্যবাহী গান্ধী পরিবারের সদস্য ও কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীর সামনে সীমাহীন অপমান ও উপহাস অপেক্ষা করছে। অপরদিকে বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদী এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ভারত জিতেছে। ভালো দিন আসছে। আর বিজেপি নেতা প্রকাশ জাভদেকার বলেছেন, এটি পরিবর্তনের শুরু, একটি গণবিপ্লব এবং একটি নতুন যুগের সূচনা। কিন্তু বিপরীতে আর বাংলাদেশ নিয়ে তার অবস্থান কি হয় তা দেখার জন্য হয়তো আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে মন্ত্রী সভা গঠনেরও তোড়জোড় শুরু করেছে বিজেপি। এতে অন্তত ২ জন মুসলিম মন্ত্রীর নাম শোনা যাচ্ছে।
বিজেপি’র এ বিজয়ে খুবই আশাবাদী বিএনপি। আতঙ্কিত ও আশান্বিত বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো। অপরদিকে সরকারী দলের নেতারা বলছেন ভারতের নির্বাচনে উল্লসিত বা উদ্বিগ্নের কিছু নেই। ইতিমধ্যেই মোদীকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াতো বিজেপি’র জয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পুরো ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে মোদীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এর অনেক পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, বিরোধীদল নেত্রী রওশন এরশাদ এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্যরা অভিনন্দন জানিয়েছেন।
কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা হলেও এবারের নির্বাচনে হিন্দুত্ব নিয়ে প্রচার সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন মোদী। যদিও বাংলাদেশের মানুষ, ভূখ- এবং ধর্ম নিয়ে নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি নেতাদের বক্তব্য নতুন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল- মোদী প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে, গুজরাটের আদলে তিনি পুরো ভারতকে বদলে দেবেন। ভারতকে কখনও মাথা নোয়াতে দেবেন না। সব কিছুর পরও নির্বাচনে অভাবনীয় জনসমর্থন পেয়েছে বিজেপি, ভরাডুবি হয়েছে গান্ধী পরিবারের প্রতাপ আর ভারতীয় কংগ্রেসের। ৬৩ বছর বয়সি মোদীর নেতৃত্বেই তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ধর্মভিত্তিক দলটি।
ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছোট ভাই প্রহ্ল¬াদ মোদী মুসলমানদের উদ্বেগকে নাটক বলে উড়িয়ে দিলেন। তিনি বললেন, তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এটা বিরোধীদের সাজানো নাটক। তার মতে, ভারতের মুসলিমদের নরেন্দ্র মোদীকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নরেন্দ্র ভাই যখন ছোট ছিলেন, তখন তিনি গুজরাটে মুসলিমদের সঙ্গে এক সাথে খেলতেন।
ইতিমধ্যে বিজেপি’র মন্ত্রী সভা গঠনের তালিকায় ২ জন মুসলমানের নাম শোনা যাচ্ছে। জানা গেছে, নাগরিক উন্নয়ন বা সংখ্যালঘু মন্ত্রক পেতে পারেন শাহনওয়াজ হুসেন। এছাড়া সংখ্যালঘু মন্ত্রী হিসেবে মুক্তার আব্বাস নকভির নামও ভাবা হচ্ছে।
ভারতে বিজেপি’র মতো হিন্দু উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক দল ক্ষমতায় আসাতে বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো আশাবাদী হয়ে উঠেছে। তারা মনে করছেন, বাংলাদেশের যে সব প্রগতিশীল ও ভারতঘেঁষা বুদ্ধিজীবী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় আসার কারণে এ দাবি এখন বাজারজাত সহজ হবে না। তারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসে মোদী আগের মুসলিম বিদ্বেষী হিং¯্রতার পথ থেকে সরে এসে মানবতাবাদী হয়ে দেশ চালাবেন। একই সঙ্গে তিস্তার পানি ও সীমান্ত সমস্যারও সমাধান করবেন। তবে, আগের মতো মুসলিম নিধনের শঙ্কাও কাজ করছে ইসলামী দলগুলোর কোনো কোনো নেতার মধ্যে। তাদের উদ্বেগ, মোদী যদি আগের অবস্থান থেকে সরে না আসেন তাহলে ভারতীয় মুসলমানদের কপাল ভাঙলো।
ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বলেন, বিজেপি ভারতীয় রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসায় আমরা আতঙ্কিত, আমরা শঙ্কিত। অন্যদিকে আমরা আশাবাদীও। তিনি বলেন, ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দেশে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে কেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে পারব না। ধর্মভিত্তিক দল ভারতে যেমন আছে, তেমনি অস্ট্রেলিয়া ও ক্নাাডার মতো দেশেও আছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আমাদের শঙ্কা আছে। কারণ তার হাত হাজার হাজার মুসলমানের রক্তমাখানো। তবে আমরা এও আশাবাদী, ক্ষমতায় গিয়ে তিনি দায়িত্বশীল আচরণ করবেন। আগের মুসলিম নির্যাতনের পথ থেকে সরে এসে মানবতার পথে আসবেন। কারণ, দায়িত্বই মানুষকে সভ্য করে তোলে।
ইসলামী আন্দোলনের আমীর চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আশরাফ আলী বলেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারণাতে মোদী ’৪৭ পরবর্তীতে ভারতে যাওয়াদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন। এটা যদি কার্যকর হয় তাহলে আমরা আতঙ্কিত। এখন দেখা যাক ক্ষমতায় গিয়ে তিনি কী করেন। যদি ভালো আচরণ করেন তাহলে প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদেরও সুসম্পর্ক থাকবে, এটা ইসলামেও আছে।
সরকারী দল আওয়ামী লীগ বলছে ভারতে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে এর কোন প্রভাব পড়বে না। বিএনপি বলছে প্রতিবেশী দেশটির ক্ষমতার পালাবদলের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। কংগ্রেস ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে সম্পর্ক রক্ষা করেছে বিজেপি হয়তো ততোটা যাবে না। তারা দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আর বিজেপি জোটের জয় ঢাকার জন্য স্বস্তির খবরও বটে। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে পুনরায় কংগ্রেস ক্ষমতায় আসলে এর প্রভাব পড়তো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ও সরকারে। এতে করে বিরোধী জোটের ওপর নতুন করে দমন পীড়নও বাড়তো। এখন হয়তো এমনটি আর হবে না। কারণ বিজেপির জয় অস্বস্তিকর বার্তা নিয়ে এসেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য। কংগ্রেসের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক রক্ষা করে চলা আওয়ামী লীগকে এখন নতুন করে সম্পর্ক গড়তে হবে মোদীর সরকারের সঙ্গে। এই কাজটি তাদের জন্য চ্যালেঞ্জেরও বটে। তবে দেখার বিষয় মোদী তার পররাষ্ট্র নীতিতে কি পরিবর্তন আনেন। আর বাংলাদেশ নিয়ে তার অবস্থান কি হয়। অনেকে বলছেন, মোদীর ভূমিধস উত্থানে কিছুটা হলেও পশ্চিমা প্রভাব আছে। যা তার বিদেশনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। এই প্রভাব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পড়তে পারে। তা দেখার জন্য হয়তো আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান মোদীর নেতৃত্বে ভারতের নতুন সরকার গঠিত হলে বাংলাদেশের পানি সমস্যাসহ অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা আশা করবো ভারতের নতুন সরকার এ বিষয়টিকে গুরত্বসহকারে দেখবে। অপরদিকে ভারতের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ভারতের জনগণ তাদের পছন্দের দলকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে। এ নির্বাচনের ফলাফলে আমাদের উল্লসিত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/2014/05/17/179375.php#sthash.vBVSitxb.dpuf