১৫ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা ইউসুফের পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য ॥ ১২ ফেব্রুয়ারি যুক্তিতর্ক শুরু; আমার পিতার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোন সত্যতা নেই
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, বৃহস্পতিবার,
জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা এ কে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় ডিফেন্স সাক্ষ্য হিসেবে গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাওলানা ইউসুফের বড় ছেলে এ কে এম মাহবুবুর রহমান। সাক্ষ্যতে তিনি বলেছেন, আমার পিতা সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার পিতার বিরুদ্ধে আনিত কোন অভিযোগেরই সত্যতা নেই। রাজনৈতিক কারণেই আমার পিতাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে।
এদিকে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এই মালায় উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ১২ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট চার কার্য দিবস নির্ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল বুধবার ডিফেন্স পক্ষের মাত্র একজন সাক্ষীর মাধ্যমে ডকুমেন্ট উপস্থাপনের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। পরে ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষকে আগামী ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি এবং ডিফেন্স পক্ষকে ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তি উপস্থাপনের জন্য তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে ডিফেন্স পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হবে। এরপর আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখবেন। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মাওলানা ইউসুফের পক্ষে একমাত্র ডিফেন্স সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করার পর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের দিন ধার্য করে আদেশ দেন।
আদেশের পর মাওলানা ইউসুফের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আজ এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলার ১৩টি অভিযোগের বিরুদ্ধে আমাদের কমপক্ষে ১৩ জন সাক্ষী প্রয়োজন ছিল। মামলার অভিযোগ বাগেরহাটের চারটি থানা এলাকার ঘটনা। এই হিসেবেও অন্তত প্রতি থানায় একজন করে সাক্ষী প্রয়োজন ছিল। সেই সুযোগ না থাকায় আমরা একজন ডকুমেন্টের সাক্ষী দিয়েছি। এছাড়া আমরা আদালতে মামলার নথি দিয়ে দেখিয়েছি মজিদ হত্যা মামলায় ১৯৭২ সালে বিচার করা হয়েছে। সেখানে এ কে এম ইউসুফকে আসামী করা হয়নি। আর ১৯৭৩ সালে আসামীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের অভিযোগ না থাকায় সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মুক্ত হন। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ, রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, এই মামলায় আমরা ২৭ জন সাক্ষী দিয়েছি। আর আসামীপক্ষ একজন সাক্ষী দিয়েছে। সাক্ষী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আসামী রাজাকার ও পিস কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হবে। এরপর আসামীপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করবে। এর মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম শেষ হবে। ডিফেন্স সাক্ষী প্রসঙ্গে হায়দার আলী বলেন, এই সাক্ষী দিয়ে ডিফেন্সের কোন লাভ হয়নি।
অন্যদিকে গতকাল সকালে আসামীপক্ষের একমাত্র ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মাওলানা ইউসুফের বড় ছেলে এ কে এম মাহবুবুর রহমান। জবানবন্দীতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১১ বা ১২ বছর। ’৭১ সালে আমরা খুলনা শহরের বাসায় পরিবারে অবস্থান করি। ’৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমার পিতা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলে আমরা ঢাকায় চলে আসি। আমার পিতা ও আমরা পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মিন্টু রোডে একই সঙ্গে বসবাস করতাম। ’৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মালেক মন্ত্রী সভার পদত্যাগের পর রেডক্রস ঘোষিত নিরপেক্ষ এলাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমার পিতাসহ আমরা পরিবারের সবাই আশ্রয় গ্রহণ করি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের চার বা পাঁচ দিন পরে রেডক্রস কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এরপর আমরা এক থেকে দেড় মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আমার পিতাসহ সপরিবারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিলাম। 
 
একপর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী মালেক মন্ত্রীসভার আটককৃত সদস্যদের বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে এবং বাংলাদেশ সরকার তাদের কারাগারে প্রেরণ করে। আমরা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তখন খুলনার বাড়িতে ফিরে যাই। ১৯৭২ সালে আমার পিতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সে মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। কিন্তু যেহেতু আমার পিতার বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের অভিযোগ ছিল না সেজন্য ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় আমার পিতাকে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে মুক্তি দেয়া হয়।
সাক্ষী আরো বলেন, আমার পিতা অখ- পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন সত্য কিন্তু কোন অপরাধমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ২০০৯ সাল থেকে আমার পিতার বিরুদ্ধে কিছু মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। তার একটি হল এই মামলার সাক্ষী লিয়াকত আলী খান কর্তৃক দায়েরকৃত মোড়লগঞ্জ থানার মামলা নং ২২ (৫) ২০০৯। আমার পিতার বিরুদ্ধে দালাল আইন ১৯৭২ এর অধীনে একটি মামলা হয়। এই মামলায় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৩ তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। উক্ত দ-াদেশের বিরুদ্ধে আমার পিতা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেছিলেন।
এই মামলায় কয়েকটি ঘটনা সংক্রান্ত যথাক্রমে বাগেরহাট, মোড়লগঞ্জ ও কচুয়া থানায় দায়ের করা হয়েছিল। সেখানে আসামী হিসেবে আমার পিতার নাম ছিল না। এই সেই মামলার এজাহারের ফটোকপি। সেগুলো হলো মোড়লগঞ্জ থানার মামলা নং ১৫ (২) ১৯৭২। বাগেরহাট থানার মামলা নং ১৫ (৭) ২০০৯ এবং কচুয়া থানার মামলা নং ৬ (৫) ২০০৯।  এছাড়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার পিতা কখনোই বাগেরহাট মহাকুমার কোন এলাকায় সফর করেননি বা যাননি। তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন যখন যেখানেই গিয়েছেন সরকারি প্রটোকল নিয়ে গেছেন। আমার পিতার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। রাষ্ট্রপক্ষের জেরার জবাবে সাক্ষী বলেন, আমরা আট ভাইবোন। আমার বড় এক বোন আছে এবং তিনি জীবিত আছেন। ১৯৭১ সালে আমার পিতা যখন ঢাকায় আসেন তখন ঢাকার কোন স্কুলে ভর্তি হইনি। ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের তারিখ ও সময় আমার মনে নেই। আমি শুনেছি ওই নির্বাচনে আমার পিতা অংশগ্রহণ করেছিলেন। উপনির্বাচনে বাগেরহাট ও বরিশালের কিছু অংশ নিয়ে খুলনা-২ আসন থেকে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন কি না আমার মনে নেই। সম্ভবত আমার পিতা মন্ত্রী হওয়ার পর উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আমি ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস করি।
প্রশ্ন: আপনাদের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল কি না?
উত্তর: আমাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ীতে করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা তখন তিন ভাই, তিন বোন ও আমার মাসহ সবাই ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম। এখন আমরা আট ভাইবোন। আমার পিতা শুধু রাজনীতি করেন। আমরা ভাই বোনদের কেউই রাজনীতি করি না। আমার পিতার মামলার সপক্ষে যেসকল দলিলপত্রাদি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়েছে তার কিছু আমি সরবরাহ করেছি। বাকিগুলো পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জমা দিয়েছে।
হাদিসের আলোকে মানব জীবন বইটি আমার পিতার লেখা। আমি বইটির প্রকাশক। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন কি ও কেন বইটিও আমার পিতার লেখা এবং আমি প্রকাশক। এ মামলায় আমার পিতার বিরুদ্ধে আনীত কোন অভিযোগই সত্য নয়। এরপর আদালতের প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার রাজৈর গ্রামে। খুলনা থেকে বাগেরহাটের দূরত্ব ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। ১৯৭১ সালে খুলনা থেকে বাগেরহাটে ট্রেন যোগাযোগ ছিল। সড়কপথে যোগাযোগ থাকলেও রাস্তা ভালো ছিল না। নদীপথে লঞ্চযোগেও বাগেরহাটে যাতায়াত করা যেত।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=137988