৯ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫ম সাক্ষী বললেন :আমার বাবাকে কে মেরেছে তা আমি নিজে দেখি নাই বাবাও আমাকে বলে নাই
২৫ মার্চ ২০১৪, মঙ্গলবার,

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের আব্দুর রহমান। গতকাল সোমবার সকালে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দী অসমাপ্ত থাকায় আজ মঙ্গলবার তার অবশিষ্ট জবানবন্দী রেকর্ড করা হবে। তিনি তার জবানবন্দীর শুরুতেই বলেছেন, আমার বাবাকে কে মেরেছে তা আমি নিজে দেখি নাই, আমার বাবাও আমাকে বলে নাই।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্যের মধ্যে বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গতকাল সাক্ষী আব্দুর রহমান জবানবন্দী দেন। গাজীপুর জেলা কারাগারে আটক এটিএম আজহারুল ইসলামকে এ উপলক্ষে গতকাল সকালে আনা হয় ট্রাইব্যুনালে। সাক্ষ্য গ্রহণকালে তিনি এজলাস কক্ষের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। আসামীপক্ষে উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট আব্দুস সুবহান তরফদার, রায়হান উদ্দিন ও মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন। অন্যদিকে সরকার পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম, আলতাফ উদ্দিন,তাপস কান্তি বল, রেজিয়া সুলতানা চমন প্রমুখ। ৫নং সাক্ষীর গতকালের জবানবন্দীর বিবরণ নি¤œরূপ :

আমার নাম মোঃ আব্দুর রহমান। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৫৮ বৎসর। আমার ঠিকানা : গ্রাম- রাম কৃষ্ণপুর, বানিয়াপাড়া, থানা- বদরগঞ্জ, জেলা- রংপুর।

আমার বাবাকে কে মেরেছে তাহা আমি নিজে দেখি নাই, আমার বাবাও আমাকে বলে নাই। সাক্ষী পরে বলেন যে, ঘটনার সময় আমাকে আমার বাবা বলেন নাই, তবে পরে বাবা আমাকে ঘটনার কথা বলেছেন। লোকমুখে শুনতে পাই যে, আমার বাবা গুলিবিদ্ধ হইয়া আহত হয়েছেন। পরে আমরা আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করি, কিন্তু সুচিকিৎসা করতে না পারায় স্বাধীনতার পরে তিনি মারা যান। আমার বাবা আমাকে বলেন বাঙ্গালীই আমাকে গুলি করেছে, হত্যা করার জন্য নয় শাস্তি দেওয়ার জন্য।

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল তারিখে একটি ট্রেন রংপুর থেকে এসে ১০নং রেল গেইটে এবং অপর ট্রেনটি পার্বতীপুর থেকে ৬নং রেল গেইটে এসে দাঁড়ায়। পার্বতীপুর থেকে যে ট্রেনটি এসেছিল সে ট্রেন থেকে আনুমানিক দেড়শত লোক নেমে দক্ষিণ দিকে চলে যায় এবং তারা বালা পাড়া, বাগবাগ, বুঃ বাগ হয়ে বকশীগঞ্জে গিয়ে ঝাড়–য়ার বিল ঘেরাও করে। ঐ লোকগুলোর মধ্যে অনেকের পরনে খাকী পোশাক এবং অনেকের পরনে সিভিল পোশাক ছিল, আমি অনেক দূর থেকে দেখার কারণে তাদেরকে চিনতে পারি নাই। আমি ঐ সময় ১০নং রেল গেইট থেকে আনুমানিক দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলাম। ঐ খাকী পোশাকধারী ও সিভিল পোশাক পরিহিত লোকজন যখন বকশিগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল তখন লোকজন ভয়ে পূর্ব দিকে পালাচ্ছিল। এই সময় ১০নং রেল গেইটে অবস্থানরত ট্রেন হতে এক/দেড়শ লোক নেমে দক্ষিণে বকশিগঞ্জের দিকে রওনা হয়। ঘেরাও-র মধ্যে পরে গ্রামের সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিকে-সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। তখন অনেকেই বলাবলি করতে থাকে যে, বদরগঞ্জ হতে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক লোকজন, এটিএম আজহারুল ইসলাম ও পাক সেনারা এসে ঘেরাও করেছে তোমরা সেদিকে কেন যাচ্ছ। ৬নং রেল গেইট ও ১০নং রেল গেইটের ট্রেন থেকে নেমে খাকী পোশাকধারী ও সিভিল পোশাকের লোকজন বকশীগঞ্জ অভিমুখী হইয়া দুই দিক থেকৈ পাঁচ ছয়টি মৌজা ঘেরাও করে এলোপাতারি গুলি করতে থাকে। এক পর্যায়ে খাকী পোশাকধারী ও সিভিল পোশাকের লোকেরা এলোপাতাড়ি গুলি করতে করতে ঝাড়–য়ার বিল এলাকায় আসে। তখন সেখানে আনুমানিক ৫০০/৬০০ জন লোক ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। সেখানে এক/দেড় ঘণ্টা গুলি বর্ষণ করে। আমি ঝাড়–য়ার বিলে ঐ সময় এটিএম আজহারুল ইসলামকে দেখতে পাই। ঐ গুলি বর্ষণের কারণে শুধুমাত্র ঝাড়–য়ার বিলে আনুমানিক ৪০০ লোক মারা যায়। ঝাড়–য়ার বিলে অবস্থানরত অপর এক/দেড়শত লোককে ধাওয়া করে পার্বতীপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রেনের দিকে নিয়ে যায়, অন্যান্য লোকজনদের সাথে। মিনাজুল ইসলাম বদরগঞ্জ হাই স্কুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। তাকে ঐ ঝাড়–য়ার বিলে হত্যা করা হয়। ইসলামী ছাত্র সংঘের লোকেরা বলে মিনাজুল ইসলামকে বাঁচতে দেওয়া উচিত হবে না, সে বেঁচে থাকলে আমাদের ক্ষতি হতে পারে। ঐ খাকী পোশাকধারী ও সিভিল পোষাকের লোকজন আনুমানিক প্রায় ১২০০ লোককে ৭নং রেল গেইটের কাছে নিয়ে এসে জড়ো করে, এই সময় ৬নং নম্বর ও ১০নং রেল গেইটে অবস্থানরত দুইটি ট্রেনকে ৭নং রেল গেইটে এসে সংযুক্ত করা হয়। সংযুক্ত করে ঐ সকল লোককে ট্রেনে উঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সময় শামসুদ্দিন মাস্টার যিনি এটিএম আজহারুল ইসলামকে প্রাইভেট পড়াতেন। তিনি আসরের নামাজ পড়ার জন্য খাকী পোশাকধারী ব্যক্তিদের, বাচ্চু খান ও এটিএম আজহারুল ইসলামের নিকট অনুরোধ করেন। এটিএম আজহারুল ইসলাম খাকী পোশাকধারী লোকজনদের কিছু বললে নামাজের জন্য ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়। তখন শামসুদ্দিন মাস্টার হাত তুলে বলেন যারা যারা নামাজ পড়তে চান তৈরি হয়ে নেন। তখন উপস্থিত সকলেই যাদের মধ্যে অনেকেই হিন্দু ছিলেন তারাও অজু করে নামাজের সারিতে দাঁড়িয়ে যায়। নামাজ শেষ হলে এটিএম আজহারুল ইসলাম ও বাচ্চু খান উপস্থিত লোকজনদের বলেন হিন্দু আদমি এক ধার হও, যুবক আদমি একধার হও। তারপরে বেছে বেছে প্রায় দুইশত যুবক ও হিন্দুকে এটিএম আজহারুল ইসলাম, বাচ্চু খান ও পাক সেনারা ট্রেনে তোলে এবং তাদেরকে নিয়ে যায়।

http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=141853