২৩ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমান : অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় নিজামীকে খালাস দেয়ার আবেদন মিজানুল ইসলামের || ১৫ টি অভিযোগ সন্দেহাতিতভাবে প্রমাণ হওয়ার দাবি করে মৃত্যুদ-ের আবেদন সরকার পক্ষের
২৫ মার্চ ২০১৪, মঙ্গলবার,

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির সাবেক মন্ত্রী বিশ্ব বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় দ্বিতীয় দফা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছে। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্যের মধ্যে বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল সোমবার বিকেল ৪ টায় মামলার কার্যক্রম শেষ মর্মে ঘোষণা করে যে কোন দিন রায় (সিএভি) হবে বলে আদেশ দেন। সরকার পক্ষে গতকাল প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী ও সৈয়দ হায়দার আলি কতিপয় ‘ল পয়েন্টে জবাব দেয়ার পর মাওলানা নিজামীর আইনজীবি এডভোকেট মিজানুল ইসলামও পাল্টা জবাব দেন। তিনি বলেন, প্রতিটি অভিযোগ তারা প্রমাণ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি সসম্মানে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে বেকসুর খালাস দেয়ার আবেদন জানান। অন্যদিকে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী দাাব করেন যে, তারা ১৬ টির মধ্যে ১৫টিই সন্দেহাতিতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন। তিনি আসামী মতিউর রহমান নিজামীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দেয়ার প্রার্থনা করেন।

চুড়ান্ত আর্গুমেন্ট উপলক্ষে গতকাল সোমবারও পূর্বের মত গাজিপুরস্থ কাশিমপুর-১ কারাগারে আটক মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কড়া পুলিশ প্রহরায় নিয়ে আসা হয় পুরাতন হাইকোর্ট ভবনস্থ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়। তার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনকালে তিনি ট্রাইব্যুনাল-১ এর কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। গতকাল আসামীপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, নাজিব মোমেন, মতিউর রহমান আকন্দ, আসাদ উদ্দিন, হাসানুল বান্না সোহাগ, আমিনুল ইসলাম বাপ্পি প্রমুখ। অপরদিকে সরকার পক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন, প্রসিকিউটর আলতাফ উদ্দিন, মীর ইকবাল হোসেন, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।

প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী বলেন, মতিউর রহমান নিজামীর ছিল পূর্ণ ক্ষমতা, সুপ্রিম পাওয়ার। ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসেবে তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল আল বদর বাহিনীর উপর। গণহত্যায় উৎসাহিত করা ছাড়াও উস্কানি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জনসম্মুখে কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোন কিছু বললে চলমান ঘটনার ওপর যদি তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে উস্কানি অপরাধের মধ্যে গণ্য হবে।

তিনি বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বী নিমূর্ল করতে চেয়েছিল তারা। দেশকে বুদ্ধিজীবী শূন্য করা ছিল পরিকল্পনা মাফিক। নিজামী বক্তৃতার মাধ্যমে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। নেতারা কখনও লিখিত নির্দেশ দেয় না। তাদের বক্তৃতাই উস্কানির জন্য যথেষ্ট। নিজামী দেখিয়ে দিয়েছেন সেই মতে সেনাবাহিনী মানুষ হত্যা করেছে, এটাও উস্কানি।

প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলার রায়ে উস্কানির সংজ্ঞা আপনারাই দিয়েছেন। ১৬নং চার্জ গঠন বেআইনি হয়নি। ফর্মাল চার্জে এলিগেশনে না থাকলেও ম্যাটেরিয়াল আছে। তার প্রেক্ষিতে কোর্ট চার্জ গঠন করেছে। ফর্মাল চার্জে কোন চার্জ আনা না হলেও ম্যাটেরিয়াল থাকলে কোর্ট চার্জ গঠন করতে পারে তার ভিত্তিতে।

পাল্টা জবাবে মাওলানা নিজামীর আইনজীবি এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, আমি বলেছিলাম সাক্ষী জহির উদ্দিন মোহাম্মদ জালাল ১৯৭২ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেননি। উনারা দিলেন ১৯৭৪ সালের পাসের সার্টিফিকেট যাতে বোর্ডের সিল নেই। সর্বোপরি আইনসম্মতভাবে এটা জমা দেয়া হয়নি। পরে জমা দিলে সাক্ষীকে রিকল করতে হবে এবং এক্সিবিট করার পরে সাক্ষীকে জেরা করার সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীর বক্তব্য এই আইনে প্রযোজ্য নয়। কাদের মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগ যে অবজারভেশন দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে যে, কাস্টমারী ইন্টারন্যাশনাল ল এই আইনে প্রযোজ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত চার্জ ও অতিরিক্ত সাক্ষী দেয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এতে প্রসিকিউশনের বিশেষ উদ্দেশ্য প্রমাণ করে। তাদের টার্গেটই হলো নিজামী সাহেবকে অপরাধী প্রমাণ করা। শুধু ১৬ নং চার্জ নয় ১, ৪, ৯সহ অনেকগুলো চার্জে অতিরিক্ত সাক্ষী দেয়া হয়েছে।

এডভোকেট মিজান বলেন, গোলাম আযমের মামলার রায়ের ফাইন্ডিংস এখানে প্রযোজ্য হবে না।

তিনি বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ ধ্বংস করা হয়ে থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রসিকিউমন করেছে। আসামী পক্ষ করেনি। সংবিধানের ৩৫ (২) এ বলা হয়েছে যে, একই বিষয়ে একাধিকবার বিচার করা যাবে না। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিষয়ে প্রসিকিউশন কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ আনেনি। ২ জন ব্যক্তির হত্যার বিষয়ে প্রমাণ করতে ২ জন অতিরিক্ত সাক্ষী এনেছেন। যে দুজন হত্যার বিষয় এখানে সাক্ষী আনা হয়েছে তাদের বিচার ইতঃপূর্বে সম্পন্ন হয়েছে। একজন খালাস পেয়েছেন। একজনের শাস্তি হয়েছে।

তিনি বলেন, ফর্মাল চার্জ তৈরি হয় তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে। তদন্ত কর্মকর্তা রিপোর্ট দেখেই জেরার জবাব দিবেন। তিনি আন্দাজে জবাব দিতে পারেন না। প্রসিকিউশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তারা এই মামলার ১৬টি অভিযোগের একটিও প্রমাণ করতে পারেনি। বরং বলা যায় যে, তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু যেসব সাক্ষীকে তারা ধরে নিয়ে এসেছে মামলা প্রমাণ করতে তারা অসত্য কথা বলেছেন। এই সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আসামীকে শাস্তি দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আমি আসামীর বেকসুর খালাস দেয়ার আবেদন করছি।

গত রোববার আসামিপক্ষের আইনজীবী অডভোকেট তাজুল ইসলামের আইনি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের যুক্তি-তর্ক সম্পন্ন হয়। পরে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী কতিপয় যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। গতকাল তিনি ও হায়দার আলি বাকি যুক্তি সম্পন্ন করার পর মিজানুল ইসলাম কয়েকটি পয়েন্টের জবাব দেন।

গত ১০ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত প্রসিকিউশনের পক্ষে মোহাম্মদ আলী, তুরিন আফরোজ ও সৈয়দ হায়দার আলী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এরপর আসামিপক্ষে মিজানুল ইসলাম ও তাজুল ইসলাম যুক্তি উপস্থাপন করেন ১৩ মার্চ থেকে।

এ নিয়ে আমিরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় দুইবার যুক্তি উপস্থাপন করা হলো। গত ২০ নবেম্বর এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শেষে যেকোনো দিন রায় দেয়া হবে মর্মে (সিএভি) অপেক্ষমাণ রেখে দেন আদালত। পরে গত ৩১ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির অবসরে গেলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমানই থেকে যায়। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে  ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা নিজামীর মামলায় পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শুরুর তারিখ নির্ধারণ করে আদেশ দেন।

http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=141851