২৩ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
নিজামীর পক্ষে মিজানুল ইসলামের যুক্তি তর্ক উপস্থাপন অব্যাহত: জব্দ করা ৭ শতাধিক পত্রিকার কোথায়ও আলবদর প্রধান হিসেবে মাওলানা নিজামীর নাম নেই; তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনার তদন্ত না করে ফরমায়েশি রিপোর্ট দিয়েছেন
২০ মার্চ ২০১৪, বৃহস্পতিবার,
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক মন্ত্রী বিশ্ববরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় দ্বিতীয় দফা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পঞ্চম দিনে গতকাল বুধবার আসামীপক্ষ অভিযোগ খ-ন অব্যাহত  রেখেছেন। গতকাল বুধবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্যের মধ্যে বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ যুক্তিতর্ক পেশ করেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। সকাল-বিকাল দুই বেলা আর্গুমেন্ট করার পর আজ সকাল সাড়ে ১০ টা পর্যন্তু শুনানি মুলতবি করা হয়। মিজানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সংঘটিত ঘটনার তদন্ত না করে সরকার পক্ষের চাহিত মতে একটি ফরমায়েশি রিপোর্ট দিয়েছেন, যার ভিত্তিতে চলছে এই মামলা। প্রদত্ত দলিলপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ১৯৮৬ সালে পাবনা-১ থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগ পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে কোথায়ও কোন মামলা বা অভিযোগ নেই। ঐ সময় পর্যন্ত লিখিত বই-পুস্তক বা সরকারি দলিলের কোথায়ও তার নাম নেই। এই ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলায় ৭ শতাধিক পত্রিকা জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু কোথায়ও আল বদর বাহিনী প্রধান হিসেবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নাম নেই।
চূড়ান্ত আর্গুমেন্ট উপলক্ষে গতকাল বুধবারও পূর্বের মত গাজীপুরস্থ কাশিমপুর কারাগারে আটক মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কড়া পুলিশ প্রহরায় নিয়ে আসা হয় পুরাতন হাইকোর্ট ভবনস্থ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়। সরকার পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনকালে তিনি ট্রাইব্যুনাল-১ এর কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। গতকাল আসামীপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন,মতিউর রহমান আকন্দ, আসাদ উদ্দিন, হাসানুল বান্না সোহাগ,আমিনুল ইসলাম বাপ্পি প্রমুখ। অপরদিকে সরকার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন,প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, মোহাম্মদ আলি,তুরিন আফরোজ, আলতাফ উদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।
এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সঠিকভাবে অপরাধের তদন্ত করেননি। তিনি একটি মিশন নিয়ে কিছু ঘটনা তৈরি করার জন্য যা যা করণীয় তা করেছেন। তিনি কোথায়ও সততার পরিচয় দেননি। ২৫৫টি পত্রিকার কাটিং টাইপ করা, জব্দ তালিকা তৈরি ও জব্দ করা একই সময়ে করা সম্ভব নয়। এটা বাস্তব সম্মত নয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পত্রিকার ওপর সেন্সরশীপ ছিল কি না তা তিনি জানেন না বলে কাঠগড়ায় শপথ নিয়ে বলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। আর তার জব্দ করা একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় বইতে আছে যে সেন্সর ছিল। এই বইটি তিনি পড়েছেন। তাহলে আরো স্পষ্ট যে তিনি আসলে তদন্ত করেননি। তিনি ফরমায়েশি রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন মাত্র।
মিজানুল ইসলাম বলেন, সাক্ষীর সমন ট্রাইব্যুনাল দেয়। কিন্তু তা ট্রাইব্যুনালের ইচ্ছামত হয় না, প্রসিকিউশনের ইচ্ছামত হয়। এটা ন্যায়সঙ্গত নয়। তিনি বলেন, এই ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলায় ৭ শতাধিক পত্রিকা জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু কোথায়ও আল বদর বাহিনী প্রধান হিসেবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নাম নেই।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের প্রশ্নের জবাবে মিজানুল ইসলাম বলেন, আল বদর খুব খারাপ বাহিনী হতে পারে, তারা অপরাধ করতে পারে। কিন্তু নিজামী সাহেব আল বদরের সাথে কোনভাবেই জড়িত ছিলেন না। বুদ্ধিজীবী হত্যার সময়ে বেঁচে যাওয়া দেলোয়ার হোসেন বেস্ট সাক্ষী। অথচ তাকে এই মামলায় সাক্ষীও করা হয়নি, জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। তিনি ভিকটিম এবং প্রত্যক্ষদর্শী। বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের বিষয়ে ১৯৭২ সালে ৪২টি এবং ১৯৯৭ সালে আরো একটি মামলা হয়। এই ৪৩টি মামলার কোথায়ও নিজামী সাহেবের নাম আসেনি।
তিনি বলেন, তদন্ত অব্যাহত রেখে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে এই মামলায় আসামীকে খালাস দিয়ে রায় দেয়া হলেও তিনি মুক্তি পাবেন না। তাকে সারাজীবন জেলে থাকতে হবে। এটা ন্যায়সঙ্গত নয়। দুনিয়ার কোন আইনে সেটা নেই।
মিজানুল ইসলাম বলেন, প্রদত্ত দলিলপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ১৯৮৬ সালে পাবনা-১ থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগ পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে কোথায়ও কোন মামলা বা অভিযোগ নেই। ঐ সময় পর্যন্ত লিখিত বই-পুস্তক বা সরকারি দলিলের কোথায়ও তার নাম নেই।
তিনি আরো বলেন,পাবনা জেলার স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা আমরা প্রদর্শনী করেছি। তাতে নিজামী সাহেবের নাম নেই। ১৯৫৯ সালে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিল সামরিক সরকার। শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়। সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সাথে এর কোন সম্পর্ক ছিল না। তার পরেও তারা এই ধরনের একটি সাজেশন দিয়েছেন কেন তারা ভাল জানেন।  তিনি বলেন, চার্জ নং-১ এ মাওলানা কসিমউদ্দিন ও অপর দুইজনকে হত্যার সাথে মতিউর রহমান নিজামীকে জড়ানো হয়েছে। পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের কথা বইটি লিখেছেন জহুরুল ইসলাম বিশু। প্রসিকিউশন এই বইটি প্রদর্শনী করেছেন। তাতে কোথাও নিজামী সাহেবের নাম নেই। মাওলানা কসিমউদ্দিনের এক ছেলে জিএসএম আমিন চিশতি পাবনা শহরেই বাস করেন। তাকে হাজির করা হয়নি। তার আরেক ছেলে শিবলী যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাকে জড়িয়ে মিথ্যা বক্তব্য ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হাবিবুর রহমান  কর্তৃক দেয়ার জন্য। সাক্ষী হাবিব শিবলিকে জড়িয়ে অসত্য কথা বলেছেন। এ জন্য তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, সাক্ষী ইউসুফ আলী তদন্ত কর্মকর্তাকে ঘটনা বলার আগে কারো কাছে বলেননি। অথচ তিনি প্রত্যক্ষদর্শী। আইওই বা তা জানলেন কিভাবে। তাহলে কি কোন এক ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় জেনেছেন? এই সাক্ষী সেনাবাহিনীর জিপের সামনেও দেখেছেন পেছনেও দেখেছেন। এটা বাস্তব সম্মত নয়। তিনি যে চায়ের দোকানে বসেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন সেই দোকানদারের নামও জানেন না।
সরকার পক্ষের কোন ডকুমেন্টেই প্রমাণ করে না যে কসিমউদ্দিন মাওলানা ও অপর দুইজনের হত্যাকা-ের সাথে নিজামী সাহেবের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক ছিল।
সাক্ষী আয়নাল হক নিজেকে বিবিসি বলে দাবি করেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে বিবিসির খবর কখন সম্প্রচার হতো সেটাই সঠিকভাবে বলতে পারেননি।
এডভোকেট মিজান বলেন,সাক্ষী শামসুল হক নান্নু বললেন পাবনা আলিয়া মাদরাসায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠিত হয় জুলাই মাসে। আর অভিযোগ হলো এপ্রিল মাসে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে তিনি ৮০’র দশকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে মিথ্যা কথা বলেছেন’ এই চ্যানেলটি চালু হয়েছে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ তারিখে। শামসুল হক নান্নু ৭ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে সারাদিন নিজামী সাহেবকে পাবনা দেখেছেন, আর ২নং সাক্ষী তাকে সারাদিনই দেখেছেন ঢাকায়। এটা ঐ সময়ের পক্ষে কি করে সম্ভব? তার জন্ম ১৯৫৪ সালে। ৩ মাস বয়সে তিনি নিজামী সাহেব ও তোফাজ্জলকে বোয়ালমারি মাদরাসায় পড়তে দেখেছেন। এত মিথ্যাচারের পর তার বক্তব্যের কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আপনার বক্তব্য সত্য হলে মনে হয় যে পাবনার ঐ হাসপাতালটা (মানসিক হাসপাতাল) কেন হয়েছিল।
মিজানুল ইসলাম আরো বলেন, রূপসী বাউশগাড়ী, ডেমরা গ্রামের ঘটনা প্রমাণ করতে তারা ঐসব গ্রামের কোন সাক্ষী আনেনি। নিজামী সাহেব ঐ ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না এটা প্রকাশ হয়ে পড়বে বিধায় তারা ঐ গ্রামের  কোন সাক্ষী আনেনি। অনেক দূরবর্তী একজন সাক্ষী এনেছেন যিনি শোনা সাক্ষী (এডভোকেট শামসুল হক নান্নু) যার বক্তব্যের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।
তিনি বলেন,প্রসিকিউশন এই মামলায় ১৯৭১ সালে নিজামী সাহেবের পাবনায় উপস্থিতি প্রমাণ করতে কোন পুলিশ এ্যাবস্ট্রাক দাখিল করেননি। তাতে নিজামী সাহেবের নাম না থাকায় হয়তো সেটা দাখিল করা হয়নি। অথচ মাওলানা সুবহান সাহেবের মামলায় দাখিল করা হয়েছে। নিখিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি পাবনায় গেলে অবশ্যই পুলিশ এ্যাস্ট্রাক্ট থাকতো। তেমন কিছুই দাখিল করতে পারেনি প্রসিকিউশন।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=141426