৯ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আজহারের বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষীর জবানবন্দী প্রদান ॥ কাল জেরা
১৭ মার্চ ২০১৪, সোমবার,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন মোঃ মেছের উদ্দিন। গতকাল রোববার তার জবানবন্দী শেষ হলে পূর্বে সাক্ষীর নাম সরবরাহ না করায় জেরা করতে আপত্তি জানান আজহারের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুস সুবহান তরফদার। তার আপত্তি বিবেচনা করে আগামীকাল মঙ্গলবার জেরার দিন ধার্য করেন  ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্যের মধ্যে বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গতকাল রোববার সাক্ষী মেছের উদ্দিন জবানবন্দী দেন। গাজীপুর জেলা কারাগারে আটক এটিএম আজহারুল ইসলামকে এ উপলক্ষে গতকাল সকালে আনা হয়  ট্রাইব্যুনালে। সাক্ষ্য গ্রহণকালে তিনি এজলাস কক্ষের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। আসামীপক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট শিশির রায়হান উদ্দিন ও মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন। অন্যদিকে সরকার পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম, তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম, তাপস কান্তি বল, রেজিয়া সুলতানা চমন প্রমুখ।
৪নং সাক্ষীর জবানবন্দীর বিবরণ নি¤œরূপ :
আমার নাম মোঃ মেছের উদ্দিন। আমার পিতার নাম মৃত আব্দুল গফুর। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৬৬ বছর। আমার ঠিকানা- গ্রাম-রামকৃষ্ণপুর (বানিয়াপাড়া), ৮ নং রামনাথপুর ইউনিয়ন, থানা-বদরগঞ্জ, জেলা-রংপুর।
আমার পেশা শিক্ষকতা। বদরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকাকালীন ২০০৯ সালে চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করি। ১৯৭৪ সালে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হইতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করি। উল্লেখ্য, উক্ত পরীক্ষা ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। আমি আমার গ্রামের আশরাফগঞ্জ প্রাইমারী স্কুল হতে প্রাইমারী শিক্ষা সমাপ্ত করে পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর থানাধীন নুরুল হুদা হাই মাদরাসা (যা পরে হাই স্কুলে উন্নীত হয়) থেকে ১৯৬৬ সালে এস.এস.সি পাস করি। আমি পার্বতীপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ হতে ১৯৭০ সালে বি.এ ডিগ্রি পাস করি। আমি কলেজ ছাত্রজীবনে কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম না, তবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থক ছিলাম। ঐ সময় কারমাইকেল কলেজে আইয়ুব খানের এন.এস.এফ ও জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘও ছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আমাদের এলাকায় জাতীয় পরিষদ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছিলেন নুরুল হক এডভোকেট এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন মোখলেছুর রহমান এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন এলাহী বক্স সরকার এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিল মীর আফজাল হোসেন। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐ দুই প্রার্থী বিজয়ী হন। ঐ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পক্ষে এটিএম আজহারুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রনেতা হিসেবে এবং ঐ এলাকায় (বদরগঞ্জ থানাধীন) তাহার বাড়ি হওয়ায় তিনি তাদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়। ঐ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শাহ আজিজুল হক, ডাক্তার বারী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৭০ সালে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ-তে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে সারা দেশের মানুষের মত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও বিক্ষুব্ধ হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল করে রাজশাহী শহরের দিকে যায়, ঐ মিছিলে আমিও ছিলাম। মিছিলের উপর গুলী বর্ষণ হলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরে আসি। বিকালে কারফিউ জারি হলে আমি ও আমার বন্ধু মোতালেব হল ত্যাগ করে রেল লাইন দিয়ে সারদায় আসি এবং এরপর নাটোর হয়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসি। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আহ্বান জানালে বদরগঞ্জেও আওয়ামী লীগের লোকজন ও ছাত্ররা মিলে সংগ্রাম কমিটি গঠন করে, তার সভাপতি ছিলেন আব্দুল জব্বার সরকার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকবাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ শুরু করলে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টেও বাঙ্গালী অফিসারদের উপর আক্রমণ শুরু করে। ২৬ মার্চ ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও তার অন্যান্য সঙ্গীয়রা বিদ্রোহ করে বদরগঞ্জ এলাকার রামনাথপুর ইউনিয়নের টেকশোর হাটের ইউনিয়ন অফিসে অবস্থান গ্রহণ করেন। আমরা আহত সৈনিকদের বদরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই এবং ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও তার অন্যান্য সঙ্গীয়দের খোলাহাটীতে অবস্থিত রেলের স্টোরে (যেখানে বর্তমানে শহীদ মাহবুব ক্যান্টনমেন্ট প্রতিষ্ঠা হয়েছে) থাকা ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করি। অপর একটি গ্রুপ যেখানে সুবেদার শহীদুল ইসলাম, তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা শাহনেওয়াজ আলী (বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান), বর্তমান বদরগঞ্জ থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মাহবুবুর রহমান ওরফে হাবলু আনুমানিক এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে বদরগঞ্জ থানা রামনাথপুর ইউনিয়নের ঘাটাবিল প্রাইমারী স্কুলে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন আনোয়ার এবং শহীদুল ইসলাম বদরগঞ্জের যমুনাশ্বরী নদীর উপরে মেলার মাঠে ব্যারিকেড তৈরি করে যাতে পাক সেনারা রংপুর ক্যান্টনমেন্ট হতে বদরগঞ্জে না আসতে পারে। ৮ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সকালের দিকে পাক বাহিনী যমুনাশ্বরী নদীর পূর্ব দিকে অবস্থান গ্রহণ করে এবং ক্যাপ্টেন আনোয়ার এবং শহীদুল ইসলামের বাহিনী নদীর পশ্চিম দিকে অবস্থান নেয়। পাক বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। একপর্যায়ে পাক বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোষরদের সহযোগিতায় কৌশলে বিভিন্ন পথে নদী পার হয়ে ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও শহীদুল ইসলামের বাহিনীকে পিছন দিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং তাদের উপর আক্রমণ চালায়। পাক বাহিনীর আক্রমণে তিনজন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সৈন্য ঘটনাস্থলে মারা যায় এবং ক্যাপ্টেন আনোয়ার আহত হয়। তখন ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও তার অন্যান্য সহযোগীরা পশ্চাৎপদ হন এবং ফুলবাড়ির দিকে চলে যান। পাক বাহিনী বদরগঞ্জ থানা দখল করে। বদরগঞ্জ ৭ নং রেল গোমটি সংলগ্ন রেল লাইনের দক্ষিণ পাশে লাগা রহমানের বাড়ি। উক্ত বাড়ি হইতে তিন বাড়ি পরে দক্ষিণ দিকে আমার বাড়ি। আমার বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে পৌনে এক কিলোমিটার দূরে টেকশোর হাট ৬ নং রেল গোমটি অবস্থিত। এর পশ্চিমে আনুমানিক ১০ কিলোমিটার দূরে পার্বতীপুর অবস্থিত। আমার বাড়ি থেকে পূর্ব দিকে ৩ কিলোমিটার দূরে ১০ নং রেল গেইট। আমাদের বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে ঝাড়–য়ার বিল। ১৫ এপ্রিল ১৯৭১ সালে পাক বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা রামনাথপুর ইউনিয়নের আমাদের পাড়াসহ কয়েকটি পাড়ায় অগ্নিসংযোগ করে এবং জুম্মন, ভুলু বাউলা, মুসারো কাইলটা এবং কান্দুকে হত্যা করে। পরদিন ১৬ এপ্রিল রংপুর থেকে একটি ট্রেনে করে পাক বাহিনী ও এটিএম আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা ৬ নং রেল গেইটে আসে। ট্রেন থেকে নেমে ঐ পাকবাহিনী এবং এটিএম
আজহারুল ইসলামসহ উত্তর দিকে রামনাথপুর ইউনিয়নের মোকছেদপুর এলাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে দুই পাশের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ ও গুলীবর্ষণ করতে থাকে। উক্ত এলাকার লোকজন ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য উত্তর মোকছেদপুর এবং ধাপপাড়া এলাকার দিকে পালাতে থাকে। তখন পাকবাহিনী ও এটিএম আজহারুল ইসলাম এবং তার সহযোগীরা ঐ গ্রাম ঘেরাও করে ১৫ জনকে হত্যা করে। যাদেরকে হত্যা করে তাদের মধ্যে জঙ্গলি ভরসা, বিষু, মমতাজ, আনু মাই, কালটি মাই, তমির উদ্দিন ছিল। ঘটনার সময় কালটি মাই নয় মাসের গর্ভবতী ছিল। তাকে যখন গুলী করা হয় তখন তার পেটের বাচ্চা বের হয়ে যায়। শহীদ জঙ্গলি ভরসা আমার আপন চাচীর বাবা। এই ঘটনা আমি নিজে দেখি নাই, তবে আমিনুল, মোখলেছ, মকবুল, আজমল খানসহ আরো অনেকের নিকট থেকে ঐ ঘটনার কথা আমি শুনেছিলাম।
১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল তারিখে দুপুরের দিকে একটি ট্রেন পার্বতীপুর থেকে এসে ৬ নং রেল গেটের কাছে দাঁড়ায়। তারপর ঐ ট্রেন থেকে অবাঙ্গালী বাচ্চু খান, কামরুজ্জামান এমপিএ, বদরুল, নয়িম কাজীসহ আরো অনেকে এবং খান সেনারা বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বকশীগঞ্জ ঘাটের দিকে চলে যায়। তাদের এ ধরনের আসা দেখে আমি, আমার বাবা, চাচা, ভাইসহ বাড়ির লোকজন ঝাড়–য়ার বিলের দিকে সরতে থাকি। ঐ সময় দেখতে পাই যে, রংপুরের দিক হতে আরেকটি ট্রেন ১০নং বৈরাগির গেটে এসে দাঁড়ায়। এবং ঐ ট্রেন হতে এটিএম আজহারুল ও তার সহযোগীরা পাকবাহিনীসহ নেমে তারাও বকশি গঞ্জের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পরে উভয় ট্রেনকে ৭নং রেল গেটের কাছে এনে দাঁড় করায়। তারা আমাদের ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম কৌশলে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তখন গ্রামের লোকজন ও উক্ত গ্রামে আশ্রয় নেয়া আশপাশের এলাকার লোকজন ছুটাছুটি শুরু করে এবং অনেকেই ঝাড়–য়ার বিলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় আমি আমার বাবাকে হাত দিয়ে ধরে রাখি এবং এটিএম আজহারুল ইসলামকে সাদা প্যান্ট-শার্ট পরা অবস্থায় পাকসেনাদের সঙ্গে দেখি। তখন পাকসেনারা নিরীহ জনসাধারণের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং তাদের ওপর এলাপাতাড়ি গুলী করতে থাকে এবং উক্ত গুলীতে ঝাড়–য়ার বিলের আশপাশে প্রায় ১২০০ লোক নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে প্রাণ কৃষ্ণ মাস্টার, মিনাজুল ইসলাম বিএসসি, আলাউদ্দিন, আজাদুল, ফয়েজ উদ্দিন ও তার ছেলে নূর ইসলাম, আসাদ বকশ ছিলেন। ঘটনাস্থলে অসংখ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের লাশ দেখা যায়। এটিএম আজহারুল ইসলাম তার সহযোগী ও পাকসেনারা গ্রামের অসংখ্য লোককে তাড়া করে ৭নং রেল গেটের কাছে জড়ো করে। এ সময় আসরের নামাযের সময় হলে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক শামসুদ্দিন মাস্টার আসরের নামায পড়তে চাইলে নামায পড়ার অনুমতি দেয়। নামায শেষ হলে এটিএম আজহারুল ইসলাম ও বাচ্চু খান হুকুম  দিয়ে বলেন যে, ‘ইন্দু আদমিরা’ একধার হও, যুবক আদমি একধার হও, স্টুডেন্ট আদমি একধার হও। এদের মধ্যে দুইশতের অধিক যুবককে ট্রেনে তুলে পার্বতীপুরের দিকে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে আমার খালাতো ভাই সম্বারু, আমার পাড়ার জেঠাতো ভাই ইসলাম, আবু বক্কর সিদ্দিক ও রেলের দুইজন নিরাপত্তা কর্মীকে জবাই করে হত্যা করে ঘোড়া ডোবা রেল ব্রিজের দক্ষিণ পাশে ফেলে যায়। আমার খালাতো ভাই সম্বারু সদ্য বিবাহিত ছিল, তার মৃত্যুর সংসাদ শুনে তার স্ত্রী মজিনা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এটিএম আজহারুল ইসলামসহ পাকিস্তানী বাহিনী বদরগঞ্জ শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে শহরের ধনাঢ্য জগদ্বীশ বাবুর বাড়ি দখল করে এবং ঐ বাড়িটিতে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর অফিস স্থাপন করে। এই কারণে আমার বাবা শংকিত হয়ে ৮/১০ দিন পরে আমাকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। আমি ভারতে অবস্থানকালে গঙ্গারামপুর নামক স্থানে দিনাজপুরের অনেক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আসা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা যুবকদের তালিকা করে বিভিন্ন ক্যাম্পে তাদের পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করতাম এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের পরে (দুই দিন পরে) দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে এসে শুনি, রংপুর টাউন হলে মেয়েদের এবং যুবকদের ধরে আনা হতো। এটিএম আজহারুল ইসলাম এবং পাক সেনারা এদের ধরে এনে নির্যাতন করতো। স্বাধীনতার পরে সেখানে গিয়ে অনেক আলামত দেখি। মেয়েদের ব্লাউজ, পেটিকোট এবং মৃত গলিত লাশ দেখতে পাই। আরো জানতে পারি যে, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফার স্ত্রী মনসুরাকে এটিএম আজহারুল ইসলাম ও পাক সেনারা ধর্ষণ করে, ফলে তার ছয় মাসের বাচ্চা গর্ভপাত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। আমি আরও জানতে পারি যে, এটিএম আজহারুল ইসলাম রংপুর কার মাইকেল কলেজের শিক্ষক চিত্য রায়, কালা চাঁদ রায় ও তার স্ত্রী, সুনীল চক্রবর্তী ও অপর আরেকজন শিক্ষককে ধরে নিয়ে দমদমা ব্রিজের পাশে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। আমি আরো শুনি যে, এটিএম আজহারুল ইসলামের সহযোগিতায় পাক সেনারা প্রগতিশীল ব্যক্তি জর্জেজ মিয়া, মন্টু ডাক্তার, আমার সহপাঠী মোক্তার এলাহীকেও হত্যা করে। স্বাধীনতার পরে এটিএম আজহারুল ইসলাম পলাতক ছিলেন। ১৯৭৫-এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে এটিএম আজহারুল ইসলাম পুনরায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ১৯৯৬ সালে এটিএম আজহারুল ইসলাম ও আমি রংপুর-২ বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসাবে এটিএম আজহারুল ইসলাম ২০০১ এবং ২০০৮ সালে ঐ একই এলাকা থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। উল্লেখিত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহের সহিত এটিএম আজহারুল ইসলাম জড়িত থাকায় তার বিচার চাই। অদ্য ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় এটিএম আজহারুল ইসলাম উপস্থিত আছেন (সনাক্তকৃত)।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=141153