২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
রাহুল গান্ধীর স্বপ্ন কি ভঙ্গ হতে যাচ্ছে?
১৫ মার্চ ২০১৪, শনিবার,
|| তারেক শামসুর রেহমান ||
প্রকাশ : ১৫ মার্চ, ২০১৪
তিনি রাজনীতির রাজপুত্র। রাহুল গান্ধী। ভারতের কংগ্রেসের অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং যাকে অভিহিত করেছিলেন ভারতের ‘ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে। সেই রাহুল গান্ধীর কি স্বপ্নভঙ্গ হতে যাচ্ছে? ৭ এপ্রিল শুরু হচ্ছে ভারতের ষোড়শ লোকসভার নির্বাচন। মোট ৯ দফায় এ নির্বাচন শেষ হবে ১২ মে। ১৬ মে জানা যাবে কে হতে যাচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। আর সেই নামটি যে রাহুল গান্ধী নয়, তা একাধিক জনমত জরিপেই উঠে এসেছে। একাধিক জরিপে (এপিপি নিউজ ও নিয়েলসন কোম্পানির সমীক্ষা) বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএকে (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) এগিয়ে রাখা হয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এনডিএ জোট পেতে পারে ২২৬টি আসন। আর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ (ইউনাইটেড পিপলস অ্যালায়েন্স) জোটের আসন অনেক কম, মাত্র ১০১। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বামরা পেতে পারে ৩০ আসন, তৃণমূল ২৬, আর অন্যান্য আঞ্চলিক জোট ১৬০ আসন। লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩, আর সরকার গঠন করার জন্য প্রয়োজন ২৭২টি আসন। বলা ভালো, এনডিএ জোট সর্বশেষ ২০০৯ সালের নির্বাচনে পেয়েছিল ১৫৯টি আসন, ইউপিএ ২৬২টি, বামমনারা ২৪, তৃণমূল ১৯, অন্যরা ৮২টি আসন। এখন জনমত জরিপে পিছিয়ে আছে কংগ্রেস। ম্যাজিক ফিগার ২৭২টি আসনের চেয়ে অনেক পেছনে এখন কংগ্রেস। পরপর কয়েকটি জনমত সমীক্ষায় কংগ্রেস তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারেনি।
ভারতে এই মুহূর্তে ৪টি জোট দৃশ্যমান। লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ জোট গঠিত হয়েছে। এনডিএ বা ইউপিএ জোটের বাইরে ১১টি বামমনা দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল তৃতীয় ফ্রন্ট। আর মমতা ব্যানার্জির বরাবরই বামদের ব্যাপারে আপত্তি। তাই মমতা ও জয়ললিতার নেতৃত্বে জন্ম হয়েছে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’। মূলত আঞ্চলিক দলগুলো এ ফ্রন্টের সদস্য। এরা একসময় বামদের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় জোটে ছিল। এখন তৃতীয় জোট থেকে বেরিয়ে তারা চতুর্থ জোট গঠন করেছে। মূলত তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উদ্যোগেই এ চতুর্থ জোট গঠন। এদের সঙ্গে আছে উড়িষ্যার হিন্দু জনতা দল, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা, উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি, বিহারের নীতিশকুমারের সংযুক্ত জনতা দল, অন্ধ্র প্রদেশের জগমোহন রেড্ডির কংগ্রেস, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি ও আরও ১০টি দল। জনমত জরিপে এদের এখন তৃতীয় শক্তি বলা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে এ ফ্রন্ট যদি দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে এটা ঠিক, নির্বাচনের পরপর তারা অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হবে। এ মুহূর্তে তারা নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাচ্ছেন না, এটা সত্য। তবে রাজনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে নির্বাচনের পর। বিজেপিকে ঠেকাতে এরা যদি শেষ পর্যন্ত ইউপিএ জোটের সঙ্গে ঐক্য করে সরকার গঠন করে, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে সঙ্গত কারণেই এ জোটের আসন সংখ্যা যদি ইউপিএ জোটের চেয়ে বেশি হয়, তো রাহুল গান্ধীকে তারা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেবেন না।
তাহলে কে হবেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? মমতা ব্যানার্জি নাকি জয়ললিতা? ১২ মার্চ নয়াদিল্লিতে জনসভা করেছেন মমতা। তবে বড় প্রশ্ন তো থাকলই- মাত্র ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে ইউপিএ জোট কতটুকুইবা তাদের জনমত বাড়াতে পারবে? তাহলে কি রাহুল গান্ধী ব্যর্থ হলেন? সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন। বারানসিতে গিয়ে সেখানকার রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে রাস্তায় এসে বৈঠক করেছেন (একদিন রিকশা চালানোর কথাও বলেছেন তিনি)। দিল্লি রেলস্টেশনে গিয়ে কুলিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ভূপালে নারীদের সঙ্গে বৈঠক করার সময় হিজড়াদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ফুটপাতের হকারদেরও ডেকেছেন নিজের বাসায়। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গবাদে উপজাতিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যেমন, তেমনি বৈঠক করেছেন শিল্পপতিদের সঙ্গেও। এতে করে বোঝা যায়, রাহুল নতুন এক ইমেজ নিয়ে আসছেন। তৃণমূল পর্যায়ে গরিব ও নিুমধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনমানের উন্নতি করতে চান তিনি। ভারতে এদের সংখ্যাই প্রায় ৭০ কোটি। এদের নিয়েই বিহারের লালুপ্রসাদ, মায়াবতী আর মুলায়েম সিংরা রাজনীতি করেন। মায়াবতী এদের নিয়ে রাজনীতি করে বিশাল এক আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এরা একটি শক্তি। বিশ্বব্যাংকের (২০১৩) প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের ৩ ভাগের ২ ভাগ গরিব মানুষ বাস করে ভারতে। সুতরাং রাহুল গান্ধী এদের টার্গেট করেছেন। কিন্তু তাতেও তিনি নিজের তথা দলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারেননি। তাই রাহুল গান্ধীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।
অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, কংগ্রেস যদি রাহুলের পরিবর্তে ছোট বোন প্রিয়াংকা ভদ্রকে ‘প্রমোট’ করত, তাহলে বোধ করি ভালো ফলাফল পাওয়া যেত। প্রিয়াংকা বরাবরই মা সোনিয়া গান্ধীর নির্বাচনী এলাকার (রায়বেরলি) দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনে কখনও প্রার্থী হন না। তবে ভারতের রাজনীতিতে নেহেরু পরিবার বরাবরই একটি ‘ভোটব্যাংক’। কংগ্রেস নেতারা বরাবরই নেহেরু পরিবারকে ব্যবহার করেছে। রাজনীতিতে এ পরিবারের একক কর্তৃত্ব গড়ে তুলেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর দাদা মতিলাল নেহেরু। আর রাহুল গান্ধী হচ্ছেন ইন্দিরা গান্ধীর নাতি। মতিলাল নেহেরু ১৯২১ সালে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহরলাল নেহেরুও ছিলেন কংগ্রেসের সভাপতি। জওহরলাল জীবদ্দশায় কন্যা ইন্দিরাকে কংগ্রেসের সভাপতি বানিয়েছিলেন ১৯৬৪ সালে। আর সেই একই প্রক্রিয়ায় রাহুলের পিতা রাজীব গান্ধীও কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে। পরে তিনি কংগ্রেসের সভাপতিও হন। এখন কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। মার নেতৃত্বেই রাহুল প্রথমে একজন সাধারণ সম্পাদক ও পরে অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী, এটা নির্ধারিতই ছিল। মনমোহন সিংও স্পষ্ট করেছিলেন তা। কিন্তু অংকের হিসাবটা কেন যেন বদলে যাচ্ছে! এই ব্যর্থতা কি রাহুলের? মানুষ কি পরিবর্তন চাচ্ছে? শেষ অবধি কি মোদিই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন? নাকি জন্ম হতে যাচ্ছে একটি ‘ঝুলন্ত পার্লামেন্টের’?
ভারতের রাজনীতির যারা কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন একাদশ লোকসভা নির্বাচনের পর একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, সরকার তার স্থায়িত্ব পাচ্ছে না। একাদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের মে মাসে। আর দ্বাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালের ফেব্র“য়ারিতে। একাদশ লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপির নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। তার প্রধানমন্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ১৩ দিন। বাজপেয়ী পদত্যাগ করলে জনতা দলের নেতৃত্বে একটি যুক্তফ্রন্ট সরকার সেখানে গঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হন দেবগৌড়া। দেবগৌড়া সরকারকে সমর্থন করেছিল কংগ্রেস। কংগ্রেসের সমর্থন হারিয়ে আস্থাভোটে হেরে যান দেবগৌড়া। পরে গুজরাল যুক্তফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত হলে কংগ্রেস তাকে সমর্থন করে। কিন্তু জৈন কমিশনের রিপোর্ট (রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডিএমকের জড়িত থাকার প্রমাণ) প্রকাশিত হলে পতন ঘটে গুজরাল সরকারের (২৮ নভেম্বর ১৯৯৭)। দ্বাদশ লোকসভা নির্বাচনেও কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটে। তারা আসন পেয়েছিল ১৪২ (১০ম লোকসভায় ২৩২ ও ২৫২, ১১তম লোকসভায় ১৪২), যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ১৮২ আসন। ত্রয়োদশ লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার সেখানে গঠিত হয়েছিল। তাদের শরিক ছিল আঞ্চলিক দলগুলো। আঞ্চলিক দলগুলোর সহযোগিতা নিয়েই বাজপেয়ীর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল সরকার গঠন করা। ২০০৪ সালে ১৪তম ও ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত ১৫তম লোকসভা নির্বাচনের পরপর দু’টার্ম ইউপিএ জোট বিজয়ী হয়েছিল এবং দু’দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মনমোহন সিং।
এখানে বিজেপির উত্থান নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ভারতব্যাপী কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী এখন এই বিজেপি। অথচ ১৯৮৪ সালে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন। ১৯৮৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮টিতে। আর ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৭টিতে। ১৯৯৬ সালে এ সংখ্যা ১৬২, ১৯৯৮ সালে ১৮২। পর্যায়ক্রমে বিজেপি যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে এবং কংগ্রেসের বিকল্প একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাতে পেরেছে, পরিসংখ্যানই আমাদের এ কথা বলে। এ ক্ষেত্রে ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিজেপি যদি আবার সরকার গঠন করে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জনমত জরিপ যদি সত্য হয় এবং কংগ্রেস যদি হেরে যায়, তাহলে রাহুল গান্ধীর জন্য তা হবে একটা বড় ধরনের পরাজয়। একই সঙ্গে তার নেতৃত্বের জন্য সৃষ্টি হবে বড় ধরনের হুমকি।
এ নির্বাচন বাংলাদেশকে কী মেসেজ দেবে? এ ক্ষেত্রে যেটা স্পষ্ট করেই বলা যায় তা হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয় নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না। নরেন্দ্র মোদির কট্টর ‘হিন্দুত্ববাদ’ এক ধরনের আশংকা সৃষ্টি করলেও আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান এক ধরনের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় যে সমস্যা, বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টন, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজ, বাণিজ্য ঘাটতি, ভারতের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ট্রানজিটের নামে করিডোর, সীমান্ত সমস্যা তথা ছিটমহল বিনিময় ইত্যাদির ক্ষেত্রে চটজলদি কোনো সমাধান আসবে বলেও মনে হয় না। আমাদের একটা বড় সমস্যা হল, দরকষাকষিতে আমরা আমাদের দক্ষতা দেখাতে পারিনি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অতিমাত্রায় ভারতকেন্দ্রিক হলেও আমরা আমাদের স্বার্থ আদায় করে নিতে পারিনি। আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যস্ত ছিলেন বিদেশ ভ্রমণে। এখন একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি। তিনি ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’তে বিশ্বাস করেন না। এগোতে চাচ্ছেন ধীরে। তাই বাংলাদেশের অনেক স্বার্থ থাকবে ভারতের ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে। মে মাসের শেষ দিকে নয়াদিল্লিতে নতুন সরকার গঠিত হলেই সংলাপ শুরু করতে হবে। অনেক বিষয় আছে আমাদের অমীমাংসিত।
তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahmanbd@yahoo.com
- See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2014/03/15/77886#sthash.AL1oZThX.dpuf