২৩ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়েছে
১৪ মার্চ ২০১৪, শুক্রবার,

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক মন্ত্রী বিশ্ব বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় দ্বিতীয় দফা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের চতুর্থ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার আসামীপক্ষ অভিযোগ খ-ন শুরু করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ যুক্তিতর্ক পেশ করেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। সরকার পক্ষের দাখিলকৃত বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকেই তিনি দেখিয়ে দেন যে, আলবদর বাহিনীর গঠন কোথায় কার নেতৃত্বে হয়েছে এবং এই বাহিনীর প্রধান কে ছিলেন তা নিয়ে নানা অসঙ্গতি ও স্ববিরোধিতা রয়েছে। তারা যখন যেমন খুশি তখন তেমন যুক্তি দেখান। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশে এবং সব আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। গতকাল সকালের সেশনে আড়াই ঘণ্টা আর্গুমেন্টের পর আগামী ১৯ মার্চ পর্যন্তু শুনানি মুলতবি করা হয়।
চূড়ান্ত আর্গুমেন্ট উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবারও পূর্বের তিন দিনের মত গাজীপুরস্থ কাশিমপুর কারাগারে আটক মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কড়া পুলিশ প্রহরায় নিয়ে আসা হয় পুরাতন হাইকোর্ট ভবনস্থ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়। সরকার পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনকালে তিনি ট্রাইব্যুনাল-১ এর কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, এই মামলায় ফৌজদারী দ-বিধি, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য নয়। যে আইনে বিচার হচ্ছে সেই আইন ও সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। মামলা প্রমাণ হওয়ার আগেই আসামীর এমন কিছু অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে যা দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করেছে। আমার এই বক্তব্যের সাথে একমত হয়ে সাবেক চেয়ারম্যান ফজলে কবির সাহেব বলেছিলেন যে, এই আইনে অভিযোগ আনার পরে আসামী তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে যান। তিনি তো সব আইনগত সুবিধা পাবেন না। এই আইন করা হয়েছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সদস্য ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য। আর তাদের যারা সহযোগিতা করেছিল সেইসব বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচারের জন্য দালাল আইন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে আইন সংশোধন করে বেসামরিক ব্যক্তিদের জন্য সামরিক ব্যক্তিদের জন্য প্রণীত আইনে বিচারের বিধান করেছে যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। রুল তৈরী করেছেন বিচারকরা যার মধ্যে একাধিক ধারা আসামীর পক্ষে থাকায় তা এজলাসে বসে সংশোধন করেছেন সাবেক চেয়ারম্যান নাসিম সাহেব।
মিজানুল ইসলাম বলেন, রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়েরকৃত মামলাসহ ৩টি মামলায় আটক করা হয় মাওলানা নিজামীসহ ৪ জনকে। পল্লবী থানায় দায়েরকৃত মামলায় ১২ জন আসামী থাকলেও তদন্ত ছাড়াই ৮ জনকে বাদ দিয়ে ৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়। আর এই ৪ জনই হলেন একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতা। এর মাধ্যমে শুরু থেকেই বেআইনীভাবে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করার প্রমাণ মেলে। কোন আইনে না থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব পল্লবী থানার মামলাটি ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করলেন। কোন আইনেই তাকে এই ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অথচ তিনি তা করলেন আর ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার সাহেব তা তদন্ত সংস্থায় স্থানান্তর করলেন যা তিনি কোন আইন বলেই পারেন না। আসমান উল্টে যদি নীচে চলে আসে আর সাগরের সব পানি যদি আসমানে উঠে যায় তবুও বিচারকরা আইনের ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন না। কিন্তু এখানে তা করা হয়েছে। গ্রেফতারের আদেশ যখন চাওয়া হয় তখন কি অভিযোগর ভিত্তিতে চাওয়া হয় জিজ্ঞেস করলে তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছিলেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানা চান। তার অনেক আগেই অন্য মামলায় আটক থাকায় এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। অথচ আইও তার জবানবন্দী ও জেরায় বলেছেন তার অনেক পরে তিনি তদন্ত শুরু করেছেন। দৈনিক সংগ্রামের ১৯৭১ সালের একটি পেপার কাটিং এবং একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় বই  এই দুটি ডকুমেন্ট জব্দ করা হয়েছে অনেক পরে। অথচ এই দুটি ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানা চেয়েছিলেন। যে ডকুমেন্ট কয়েকমাস পরে জব্দ করেন তার ভিত্তিতে কয়েক মাস আগে কি করে গ্রেফতারের আবেদন করলেন? আবার ফর্মাল চার্জ দাখিলের পরেও তিনি তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন মর্মে উল্লেখ করেছেন। কোন আইনেই এটা অনুমোদন করে না। তার পরেও সেটা করা হয়েছে।
মিজানুল ইসলাম বলেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার ডিজাইন তৈরী করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বসে আর তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে ডিজিএফআই এর মাধ্যমে। এই মামলার অন্যতম সাক্ষী এডভোকেট শামসুল হক নান্নু একাধিক টিভি সাক্ষাৎকারে তার উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ফর্মাল চার্জে দ্বি-জাতি তত্ত্ব ভুল ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ দ্বি-জাতি তত্ত্বের জন্য যারা সংগ্রাম করেছেন তাদেরকে তারা গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলেছেন। অক্সিলিয়ারী ফোর্সের সঙ্গা মানা হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন যে, অক্সিলিয়ারী ফোর্স কি তা তিনি জানেন না। অথচ তিনি আলবদরকে অক্সিলিয়ারী ফোর্স বলেছেন।
আলবদরের জন্ম কোথায় হয়েছিল সে সম্পর্কে প্রসিকিউশন নানা জায়গায় নানা কথা বলেছে। সানসেট এট মিড ডে বইতে তারা বলছে, নোয়াখালীতে মহিউদ্দিন চৌধুরী আল বদর গঠন করেন। মাওলানা একেএম ইউসুফ সাহেবের মামলায় বলা হয়েছে তিনি খুলনায় প্রথম রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠন করেন মে মাসে। ৭১ এর দশ মাস বইতে বলা হয়েছে জুন মাসে আলবদর বাহিনী গঠন করা হয় বিহারী ও মাদ্রাসা ছাত্রদের নিয়ে। একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় বইতে বলা হয়েছে ঢাকার লালবাগে বদর বাহিনী গঠিত হয় মাদ্রাসা ছাত্র ও বিহারীদের নিয়ে। শাহরিয়ার কবিরের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বইয়ে বলা হয়েছে, কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে জামালপুরে প্রথম আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। ফর্মাল চার্জে তারা বলেছেন ২২ এপ্রিল জামালপুরে প্রথম আলবদর গঠিত হয়। এই বইগুলো সবই তাদের দাখিল করা বই। আর মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বাহিনী গঠন করেন ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেন বলে বলা হয়েছে। অথচ তিনি ৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেন মর্মে কোন প্রমাণ তারা দাখিল করেননি। প্রসিকিউশনের কোন বক্তব্য সত্য ? সেলিম মনসুর খালেদের যে বই তারা এ্ই মামলায় ব্যবহার করছেন তা উর্দুতে লেখা যার প্রকাশক, অনুবাদকের নাম নেই। বইটা বাজারেও পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, নিজামী সাহেব আলবদরের প্রধান ছিলেন মর্মে তারা অসমর্থিত ও রেফারেন্সবিহীন বই থেকে তারা বলতে চেয়েছেন। তিনি যেহেতু ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন তিনিই আলবদরের প্রধান ছিলেন। আবার এটাও তাদের ডকুমেন্টেই আছে যে, ৩০ সেপ্টেম্বরের পরে তিনি ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন না। তাহলে নবেম্বর-ডিসেম্বরের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে কিভাবে আসে? আবার তারাই ১১-১২-১৯৭১ তারিখের দৈনিক সংগ্রাম দাখিল করেছেন যাতে বায়তুল মোকাররমে আলবদরের পথসভার খবর ও ছবি আছে যাতে আলবদর প্রধান হিসেবে অন্য এক ব্যক্তির নাম আছে।
মিজানুল ইসলাম বলেন, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ মাওলানা নিজামীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ¦ী। ১৯৮৬ সালে প্রথম নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর থেকেই নিজামী সাহেবের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু হয়। তার আগে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ কেউ করেনি। সাইয়িদ সাহেবও তার আগে কিছু লেখেননি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই পাবনা জেলা পুলিশ সুপারের মাধ্যমে জেলার স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদরদের তালিকা তৈরী করা হয়। তাতে কোথায়ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নাম নেই।
এই মামলার ১ নং সাক্ষী মিছবাহুর রহমান চৌধুরী পদে পদে মিথ্যা কথা বলেছেন। তার কোন একাডেমিক লেখাপড়ার সার্টিফিকেট নেই, অথচ বলেছেন কুষ্টিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেছেন। আমরা ঐ বছরের টেবুলেশন শিট জমা দিয়েছি যাতে তার নাম নেই। সে যে চিঠি দাখিল করেছে তা ফটোকপি তাতে নানা অসঙ্গতি রয়েছে।
দ্বিতীয় দফা যুক্তি উপস্থাপনের চতুর্থ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার  আসামীপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন  ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, এডভোকেট আসাদ উদ্দিন, হাসানুল বান্না সোহাগ, আমিনুল ইসলাম বাপ্পি প্রমুখ। অপরদিকে আসামী পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলি, মীর ইকবাল হোসেন, আলতাফ উদ্দিন, সায়েদুল ইসলাম সুমন, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=140878