১০ জুলাই ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
’৭১-এর কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধে মাওলানা নিজামীর মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ফের শুরু
১১ মার্চ ২০১৪, মঙ্গলবার,

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ফের শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিনে সরকার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী। গতকাল সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্তু আড়াই ঘণ্টা তার যুক্তি উপস্থাপনের পর আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। আজ পুনরায় তিনি যুক্তি পেশ করবেন। প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে আসামীপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করবেন। দ্বিতীয় দফা যুক্তিতর্কের প্রথম দিনেই গতকাল কয়েকটি রেফারেন্সবিহীন অথবা পক্ষপাতমূলক বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে মোহাম্মদ আলী প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে,মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীই ছিলেন আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা সুপ্রিম কমান্ডার।
গত বছরের ২০ নবেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু এরই মধ্যে গত ৩১ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর অবসরে চলে যাওয়ায় মামলার রায় আর ঘোষণা করা হয়নি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর ২৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এর কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। কার্যক্রম পুনরায় শুরুর পর ওই দিনই ট্রাইব্যুনাল মাওলানা নিজামীর মামলায় ফের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ১০ মার্চ দিন ধার্য করেন।
এ উপলক্ষে গতকাল সোমবার গাজীপুরস্থ কাশিমপুর কারাগারে আটক মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কড়া পুলিশ প্রহরায় নিয়ে আসা হয় পুরাতন হাইকোর্ট ভবনস্থ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়। সরকার পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনকালে তিনি ট্রাইব্যুনাল-১ এর কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পাঞ্জাবী-পাজামা ,মাথায় টুপি পরিহিত মাওলানা নিজামী এ সময় ছিলেন তার স্বভাব-সুলভ শান্ত ও স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় দফা যুক্তি উপস্থাপনের প্রথম দিনে গতকাল সোমবার প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী বলেন, ১৯৭১ সালে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন নিখিল পাকিস্তান ইসলামী জমিয়তে তালাবা বা ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি। বর্তমানে সেটাই ইসলামী ছাত্রশিবির। একটি পত্রিকা দেখিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরকে আমেরিকার একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বের ১০টি সন্ত্রাসী সংগঠনের মধ্যে তৃতীয় স্থানে তালিকাভুক্ত করেছে। ১৯৭১ সালে ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়েই আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়। সুতরাং ছাত্রসংঘের সভাপতি হিসেবে তিনিই ছিলেন আলবদর বাহিনীর প্রধান। আলবদর একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগি বাহিনী (অক্সিলিয়ারি ফোর্স) হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে। এই বাহিনীকে সেনাবাহিনীর অধিনে বিশেষভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারা সব অপারেশনে অংশ নিতো না, বাছাই করা কিছু অপারেশনে তারা অংশ নিতো। তাদের মাথাপিছু তখন ভাতা ছিল ৯০ টাকা যা তখনকার হিসেবে উচ্চ বেতন।
মোহাম্মদ আলি বলেন,আলবদরদের শপথ ছিল এই ,“আমি আল্লাহকে হাজির রেখে শপথ করছি যে পাকিস্তানের অখ-তায় আচড় লাগতে দিব না।” তাদের এই শপথই ছিল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে বদরযুদ্ধের বাহিনী গঠিত হয়েছিল বিধায় তারা ৩১৩ জন করে এক একটি ইউনিট গঠন করেছিল। তারাই সুপরিকল্পিতভাবে ১৫ নবেম্বর থেকে বেছে বেছে স্বাধীনতার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে বসেই তারা এই হিট লিস্ট তৈরি করে।
তিনি বলেন, মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতায় শত্রুর শেষ চিহ্ন মুছে ফেলার নির্দেশ প্রদানসহ নানা উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সহযোগিদের তিনি ভারতীয় অনুচর বলে অভিহিত করেন।
প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলি তার যুক্তি উপস্থাপনকালে যেসব বইয়ের উদ্ধৃতি দেন তার মধ্যে রয়েছে সৈয়দ ওয়ালি নাসেরের ভ্যানগার্ড অব ইসলাম,বাংলাদেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা,পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের কথা,একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়, ’৭১-এর নয় মাস, উইটনেস টু সারেন্ডার, যুদ্ধের আড়ালে যুদ্ধ, সেক্রেটারিয়লিজম,আলবদর ইত্যাদি।
আদালতে বিধিসম্মতভাবে প্রদর্শনী করা হয়নি আবার বিচারক বা আসামীপক্ষকেও সরবরাহ করা হয়নি এমন বই থেকে রেফারেন্স দিলে তার বিরোধিতা করেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। এ সম্পর্কে আদালতকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করার কারণে ট্রাইব্যুনাল মোহাম্মদ আলিকে তিরস্কার করেন এবং সতর্ক করে দেন।
আসামীপক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট তাজুল ইসলাম,ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, এডভোকেট আসাদ উদ্দিন, হাসানুল বান্না সোহাগ,আমিনুল ইসলাম বাপ্পি প্রমুখ। অপরদিকে আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, প্রসিকিউটর এস হায়দার আলি, মীর ইকবাল হোসেন, আলতাফ উদ্দিন, তুরিন আফরোজ,মোখলেসুর রহমান বাদল, হৃষিকেশ সাহা, সাইফুল ইসলাম, সায়েদুল ইসলাম সুমন,আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ ।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=140624