৩১ মে ২০২০, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষীর জবানবন্দী
৫ মার্চ ২০১৪, বুধবার,

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী মোহাম্মদ মোস্তফা মিয়া জবানবন্দী দিয়েছেন। গতকাল  সোমবার তার জবানবন্দী রেকর্ড করার পর জেরার জন্য আজ মঙ্গলবার দিন ধার্য করা হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষীর জেরা শেষে ৯ জানুয়ারী পরবর্তী সাক্ষীর দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল-১ এর তৎকালীন  চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের  নেতৃত্বে অপর দুই বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঐদিন সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি ফজলে কবির অবসরে গেলে ট্রাইব্যুনাল-১ এর অন্যান্য মামলার ন্যায় এই মামলার কার্যক্রমও বন্ধ থাকে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এম ইনায়েতুর রহিমকে সরকার নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত করার পর গতকাল এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলাটি পুনরায় শুরু হলো।
পরে সাক্ষীকে জেরা করতে বললে আজহারের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুস সুবহান তরফদার একদিন সময় চান। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আজ জেরার দিন ধার্য করেন।
গাজীপুর জেলা কারাগারে আটক এটিএম আজহারুল ইসলামকে এ উপলক্ষে গতকাল সকালেই আনা হয়  ট্রাইব্যুনালে। সাক্ষ্যগ্রহণকালে তিনি  এজলাস কক্ষের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। আসামীপক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির, রায়হান উদ্দিন ও মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন। অন্যদিকে সরকারপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম ও তাপস কান্তি বল।
জবানবন্দীর পূর্ণ বিবরণ নি¤œরূপ:
আমার নাম মোহাম্মদ মোস্তফা মিয়া মুক্তিযোদ্ধা। আমার পিতার নাম মৃত আব্দুল খালেক, মায়ের নাম মৃত সাফিয়া খাতুন। আমার বর্তমান বয়স ৭৫ বছর। আমার গ্রামের নাম কাছনা তকেয়াপাড়া, থানা কোতোয়ালী, জেলা-রংপুর। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি বিবাহিত। আমার স্ত্রীর নাম মনসুরা খাতুন। তিনি একজন বিরাঙ্গনা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তখন চৈত্র মাসে ‘যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হও।’ তখন আমি ধান-চাউলের ব্যবসা করি। আমি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। বৈশাখ মাসের শেষের দিকে আমি শুনতে পাই যে আমাদের রংপুরের আনাচে-কানাচে জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা পাকিস্তানী আর্মিদেরকে দেখিয়ে দেয় যুবকদের গুলী করে হত্যা করার জন্য। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম আমি আর দেশে থাকব না। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং-এর জন্য ভারতে যাব। আমার স্ত্রী বলে আমি দুই মাসের গর্ভবতী। আমি একা কার কাছে থাকব। তাকে আমি বলি আমার মা-বাবার সাথে থাকো এবং ব্যবসার ১৬শ টাকা আছে তা তার কাছে দেই। এরপর আমি ভারতে চলে যাই মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেয়ার জন্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার একদিন পর আমি বাড়িতে আসি। বাড়িতে এসে দেখি আমার বাড়িতে কোন লোকজন নেই। আমার পার্শ্ববর্তী লোকেরা বললো পাকিস্তানী আর্মিদের নির্যাতনে তোমার বাবা মারা গেছে। আমার স্ত্রীকে আমার বোন জোলেখা তার বাড়িতে নিয়ে যায়। আমি তখন আমার বোনের বাড়িতে গিয়ে আমার স্ত্রীকে পাগলের মত অবস্থা দেখে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি।
আমার স্ত্রীকে তার অবস্থা জানতে চাইলে সে বলে তুমি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ৪ মাস পরে ভাদ্র মাসের ৭/৮ তারিখে আমার বাড়ির দক্ষিণে রমনা সিগারেট কোম্পানির দারোয়ান মোস্তাক দাঁড়িপাল্লার দল করতো। সে দুই গাড়ি ভর্তি পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার, আল বদরসহ আমার গ্রামের দিকে নিয়ে আসে। পাকা রাস্তায় গাড়ি রেখে নেমে ফাঁকা তিন রাউন্ড গুলী করে। গ্রামের লোকেরা গুলীর আওয়াজ শুনে এদিক-ওদিক পালাতে থাকে। তারা আমার বাড়িতে আসে। তখন আমার বাবা বাড়ির আঙ্গিনায় বসেছিল। তারা আমার বাবাকে মারপিট করে এবং নাম জিজ্ঞেস করে। নাম বলার সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে তোমার ছেলের নাম কি? সে বলে মোস্তফা। তারা বলে সে কোথায়? জানি না জবাব দিলে তারা আমার বাবাকে সবাই মিলে মারপিট করে। বুট জুতা, রাইফেলের বাট লাঠি ইত্যাদি দিয়ে মারপিট করে। এই অবস্থা দেখে আমার স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়ে আসে। ভয়ে দৌড়ে প্রতিবেশী রহমানের বাড়ির দিকে যায়। পেছনে ফিরে আমার স্ত্রী দেখে ৩ জন পাকিস্তান আর্মি ও একজন বাঙ্গালি তাকে ধাওয়া করছে। আমার স্ত্রী রহমানের ঘরে গিয়ে দেখে ঐ ঘরে কোন লোক নেই। দরজা খোলা দেখে সে ঐ ঘরে প্রবেশ করে। তারা চারজনই ঘরে প্রবেশ করে আমার স্ত্রীকে বেইজ্জতি করার প্রস্তুতি নিলে আমার স্ত্রী তিনজন পাকিস্তান আর্মির পা ধরে বলে যেন তাকে বেইজ্জতি না করে। বাঙ্গালিকে সে বলে আমাকে রক্ষা করো। কিন্তু তাকে রেহাই দেয়নি। রহমানের খাটের উপর আমার স্ত্রীকে তারা একের পর এক বেইজ্জতি করে। আমার স্ত্রী খাট থেকে পড়ে যায়। আমাদের বাড়িতে অবস্থানরত আর্মিরা এ সময় বাঁশিতে ফুক দিলে আমার স্ত্রীকে ঘর থেকে বাহির করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে বের হতে চায় না। তখন পাকিস্তান আর্মি এটিএম আজহারকে বলে একে টেনে নিয়ে আস। তখন আমার স্ত্রী বুঝতে পারে যে ৩ জন পাকিস্তানী আর্মির সাথে যে বাঙ্গালি ছিল সেই এটিএম আজহার। তখন আমার স্ত্রীকে রহমানের বাড়ি থেকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসে। আমার স্ত্রী বাড়িতে এসে দেখে আমার বাবা ঘরের আঙ্গিনাতে যেখানে মেরেছিল সেখানেই বেহুশ অবস্থায় পড়ে আছে। এরপর তারা আমার স্ত্রীকে তার স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করে। সে মোস্তফা বললে তারা বলে সে কোথায় সে। বলে জানি না। তখন ঐ বাঙ্গালিরা লাঠি দিয়ে আমার স্ত্রীর কোমরে বাড়ি দেয়। তারা বলে তোমার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা তোমার ঘরে বোমা আছে। বোমা কোথায়? আমার স্ত্রী বলে আমার ঘরে কোন বোমা নেই। আমি বোমা চিনি না। তখন তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করে তছনছ করে। ঘরে থাকা ১৬শ টাকা এবং বিয়ের সময় দেয়া ৫টি স্বর্ণের তাবিজ যার ওজন এক ভরি সব বাক্স ভেঙ্গে নিয়ে যায়। আমার স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পায় সে ৩ জন পাকিস্তান আর্মি আমার বাবাকে গাড়িতে তুলছে। আমার স্ত্রীকে জোরপূর্বক গাড়িতে উঠায় চুলের মুঠি ধরে। গাড়িতে উঠে দেখে আমার বাবাকে গাড়িতে মরার মত শুইয়ে রাখা হয়েছে। গাড়ি কিছু দূর যাওয়ার পর মৃত মনে করে তারা আমার বাবাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। আমার স্ত্রীকে রংপুর টাউন হলে একটি রুমের মধ্যে নিয়ে আটকে রাখে।
ঐ রুমে আমার স্ত্রী দেখতে পায় যে, ৭/৮টি সুন্দরী মেয়েকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। রাতের বেলায় আমার স্ত্রী ও ঐসব মেয়েদেরও তারা বেইজ্জতি করতো। আমার স্ত্রী আমাকে আরো বলেছিল, যে দুটি গাড়ি আমাদের গ্রামে গিয়েছিল সেই দুইটি গাড়ি সবসময় টাউন হলের সামনে থাকতো। পাকিস্তান আর্মিরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে যুবক ও মহিলাদের ধরে নিয়ে আসার জন্য এটিএম আজহারকে ঐ গাড়িতে করে সঙ্গে নিয়ে যেতো। খোলা জানালা দিয়ে আমার স্ত্রী দেখে যে যেসব যুবককে টাউন হলে আনা হতো তাদেরকে টাউন হলের উত্তর পাশে হেলানো গাছের ডালে রশি বাঁধা। তাতে ঝুলিয়ে যুবকদের শরীর চাকু দিয়ে কেটে এসিড লাগিয়ে নির্যাতন করতো। নির্যাতনে মৃত ব্যক্তিদের পাশে একটি ইন্দিরায় ফেলে দেয়া হতো। আমার স্ত্রী আরো বলে, রাতের বেলায় আর্মি অফিসাররা অনেকেই এসে তাকেসহ অন্যান্য আটক মহিলাদের বেইজ্জতি করতো। এ কারণে টাউন হলে আটক থাকাকালে ১৮ দিন পর তার পেটের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। এ সময় ২ জন বাঙ্গালির পরামর্শ মতে আমার স্ত্রীকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় যাতে আমি আমার স্ত্রীকে দেখতে গেলে তারা যেন আমাকে আটক করতে পারে। সেইভাবে আমার স্ত্রীকে টাউন হল থেকে বের করে দিলে সে একটি রিকশা নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। বাড়িতে এসে আমার বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যায়। আমার ভগ্নিপতি নজির আমার বাবা ও স্ত্রীকে চিকিৎসা করায়। ২ দিন পর আমার বাবা মারা যায়।
পাকিস্তানী আর্মিরা আমার বাড়িঘর চিনতো না, আমাকে বা আমার বাবাকেও চিনতো না। আসামী এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মোস্তাকদের দেখানো মতে আর্মিরা আমাদের বাড়িঘর আক্রমণ করে, আমার বাবাকে নির্যাতন করে এবং আমার স্ত্রীকে বেইজ্জতি করে। (একপর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)। আমি এর বিচার চাই।
আসামী এটিএম আজহারুল ইসলাম আজ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আছেন। (সনাক্তকৃত)।
জেরা:-
প্রশ্ন : আপনি বিয়ে রংপুরে না অন্যত্র করেছিলেন?
উত্তর : নোয়াখালীতে।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=140055