১৪ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
এ কে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে একটি ঘটনায় ৫-৬ শ’ হিন্দু হত্যার অভিযোগ সাক্ষীর
২ ডিসেম্বর ২০১৩, সোমবার,
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে গতকাল ১৩তম সাক্ষী শুধাংশু মণ্ডলের জবানবন্দী গ্রহণ করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ। সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, মাওলানা ইউসুফের নির্দেশে একদিনে একটি ঘটনায় ৫০০ থেকে ৬০০ হিন্দু হত্যা করা হয়। এসব হিন্দু রামপাল থানার ডাকরা কালিবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে যাওয়ার জন্য। যেদিন তারা ওই বাড়িতে আশ্রয় নেয় সেদিনই মাওলানা ইউসুফের নির্দেশে রাজাকাররা তাদের হত্যা করে বলে জানান তিনি। জবানবন্দী : সাক্ষী তার জবানবন্দীতে প্রথমে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার নাম শুধাংশু মণ্ডল। পিতা মৃত ভবনাথ মণ্ডল। গ্রাম টেংরামারি, থানা রামপাল, জেলা বাগেরহাট। বয়স ৫৯। আমি কৃষি কাজ করি। এর পর সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর আমি স্থানীয় জবেদ কমান্ডারের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হই। ১৯ এপ্রিল ১৯৭১ আমি জানতে পারি রামপাল অডিটোরিয়াম হলে শান্তি মিটিং হবে। ওই দিন বেলা ২টা-আড়াইটার সময় আমাদের এলাকার সব লোকজন ওই মিটিংয়ে উপস্থিত হই। বেলা ৩টা-সাড়ে ৩টার সময় বাগেরহাট থেকে একটি লঞ্চ ৩০-৩৫ জন লোক নিয়ে রামপাল কলেজ ঘাটে ভেড়ে। ওই লঞ্চ থেকে ৩০-৩৫ জন লোক নামে। তারা পাকিস্তান জিন্দাবাদ, এ কে এম ইউসুফ আলী জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে দিতে অডিটোরিয়াম সভাস্থলে উপস্থিত হয়। ওই মিটিংয়ে রজ্জব আলী (মৃত), মোজাম ডাক্তার, মোসলেম ডাক্তার বক্তব্য দেয়ার পর সবশেষে বক্তব্য রাখেন এ কে এম ইউসুফ আলী। বক্তব্যে ইউসুফ আলী বলেন, মালায়ন খতম কর। এ দেশ হিন্দুদের নয়। এ দেশ মুসলমানদের। হিন্দুদের মালামাল, মহিলাসহ গনিমতের মাল। এসবই ভোগ করতে পারে যে কেউ। এতে কোনো অপরাধ নেই। সর্বশেষ বলে লোটোপাট খাও, মালায়ন খতম কর। এ কথা বলার পর নারায়ে তকবির দিয়ে ইউসুফের সঙ্গীয় লোকজন স্থানীয় রামপাল সদরে অবস্থিত যাদব মিস্ত্রি, কৃষ্ণধন মিস্ত্রি এদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়ে ঘরবাড়ি তছনছ করে মালামাল নিয়ে লঞ্চযোগে বাগেরহাটের দিকে চলে যায়। এরপর আমি বাড়িতে এসে সবাইকে এ ঘটনার কথা খুলে বলি। সাক্ষী বলেন, এ কে এম ইউসুফ আলী খুলনা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন এবং বিভিন্ন এলাকার লোকজন নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। রাজাকার বাহিনীকে ইউসুফ আলী নির্দেশ দেয়- হিন্দুদের বাড়ি নষ্ট করবা এবং যেখানে পাবা তাদের হত্যা করবা, এ দেশ পাকিস্তান। সাক্ষী বলেন, ২১ মে ১৯৭১ রামপাল থানাধীন ডাকরা কালিবাড়িতে হাজার হাজার হিন্দু এসে আশ্রয় নেয়, সেখান থেকে ভারতে চলে যাওয়ার জন্য। এ কে এম ইউসুফ বাগেরহাটের রাজাকার রজ্জব আলী, সিরাজ মাস্টারকে নির্দেশ দেন ডাকরা কালিবাড়িতে আশ্রয় গ্রহণকারী ব্যক্তিদেরকে ধ্বংস করে ফেলার জন্য। এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজাকাররা ২১ মে, ১৯৭১ তারিখে ডাকরা কালিবাড়িতে আক্রমণ করে ৫০০-৬০০ হিন্দুকে হত্যা করে। ওই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া একজনের নাম আমি বলতে পারি। সে হলো নারায়ণ চৌকিদার, যার বাড়ি আমার বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে। এ সময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসান সাক্ষীকে প্রশ্ন করেন, ইউসুফ সাহেব যে নির্দেশ দিলেন তা আপনি জানলেন কী করে? আপনি তো নির্দেশ দেয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন না। তখন সাক্ষী বলেন, আমাদের এলাকার শান্তি কমিটির নেতা সিদ্দিক মাস্টার, শাহাদাত কাজী ওরফে বাসার কাজী প্রমুখের কাছ থেকে শুনেছি ইউসুফ সাহেবের নির্দেশে রাজাকাররা ওইসব ঘটনা ঘটায়। ট্রাইব্যুনাল আবার প্রশ্ন করেন, যে দু’জনের নাম বললেন তারা কি জীবিত না মৃত। সাক্ষী বলেন, মৃত। এরপর সাক্ষী বলেন, ২২ মে ১৯৭১ সকালবেলা নারায়ণ চৌকিদার আমাদের বাড়িতে এসে সবাইকে বলল এ দেশে আর থাকা যাবে না। সবাইকে ভারতে চলে যেতে হবে। তারপর আমরা আমাদের গ্রামের সবাইকে নিয়ে ভারতে চলে যাই। ভারতের বশিরহাটে আশ্রয় নেই। সেখানে আমার বাবা-মাকে রেখে আমি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের জন্য বিহারের চালুকিয়াতে চলে যাই। ২৭ দিন ট্রেনিং শেষে আফজাল কমান্ডারের সাথে ৯ নম্বর সেক্টর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। দেশে এসে বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করি। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর ১৯৭১ বাগেরহাট থানার ঘনশ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি করে। ওই দিনই বাগেরহাট থেকে রাজাকার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে রাজাকাররা আমাদের ঘিরে ফেলে চার দিক থেকে। রাজাকারদের সাথে আমাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। জায়গাটি অচেনা বিধায় আমরা যুদ্ধে টিকতে না পেরে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাই। আমরা চার-পাঁচজন পাশের একটি সুপারি বাগানে আশ্রয় নেই। পরদিন ১৪ অক্টোবর ভোরে একটি লোক আমাদের দেখে ফেলে। সে আমাদেরকে জানায়, যেখানে আছেন সেখান থেকে নড়বেন না। আপনাদের বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় লোকজনকে ধরে রাজাকাররা চুলকাঠি বাজারে নিয়ে গেছে। সেখানে তাদেরকে হত্যা করা হবে বলে শুনেছি। এই লোকটি পরে আমাদেরকে এসে জানায় ইউসুফের নির্দেশে চুলকাঠি বাজারের কাছে একটি কাঠের ব্রিজের ওপর মোট সাতজনকে রাজাকাররা হত্যা করেছে। এর মধ্যে বিজয় দাস ও সুনীল নামে দু’জনের নাম সে আমাদেরকে বলতে পেরেছে। বাকিদের নাম বলতে পারেনি। ওই লোকটি আমাদেরকে ১৪ অক্টোবর একটি নৌকাযোগে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটায় পৌঁছে দেয়। এই আমার জবানবন্দী। অবরোধের কারণে আসামিপক্ষের সিনিয়র কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না ট্রাইব্যুনালে। গাজী এম এইচ তামিম নামে একজন মাত্র জুনিয়র আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। তিনি সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন। জেরা প্রশ্ন : ১৩ অক্টোবরের যে ঘটনা আপনি বললেন তা সত্য নয়। উত্তর : আপনার দাবি অসত্য। প্রশ্ন : ১৯ এপ্রিল সমাবেশে এ কে এম ইউসুফের বক্তব্য দেয়ার ঘটনাও সত্য নয়। উত্তর : অসত্য। প্রশ্ন : ওই বক্তব্য দিয়েছিল রজ্জব এবং মোজাম ডাক্তার। ইউসুফ সাহেব নয়। উত্তর : অসত্য। প্রশ্ন : ওই দিন ছাড়া আর কোনো শান্তি কমিটির মিটিংয়ে গেছেন কখনো? উত্তর : না। প্রশ্ন : আপনার জানামতে আর কোনো হিন্দু কি শান্তি কমিটির মিটিংয়ে গেছে কখনো? উত্তর : আমরা ভারতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত রামপালের ওই সমাবেশ ছাড়া শান্তি কমিটির আর কোনো মিটিং হয়নি। এ পর্যন্ত জেরার পর গাজী তামিম আদালতের কাছে আবেদন করেন যেহেতু সিনিয়র আইনজীবী নেই তাই জেরা মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি রাখার জন্য। তখন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসান বলেন, আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হলো। গাজী তামিম আরো সময় প্রার্থনা করলে তিনি বলেন, নো। কাল না এলে জেরা কোজ করা হবে। উকিল না আসার কারণে বিচারকদের উঠে যেতে হবে এটা আনহার্ড অব। এ সময় গাজী তামিম অবরোধের সময় সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে তাদের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেন। তখন চেয়ারম্যান বলেন, পেছনে তাকিয়ে দেখেন সব লোক এসেছে। রাস্তায় হরদম যানবাহন চলছে। অবরোধে রাজধানীর ভেতরে দোকানপাট খোলা রাখা যাবে, যানবাহন চলতে পারবে এটা বলা আছ। গাজী তামিম দাবি করেন, দোকানপাট খোলা কিন্তু যানবাহন চলতে পারে না। খুব কম চলছে। চেয়ারম্যান এ দাবির বিরোধিতা করে বলেন, আপনারা সব জায়গায় যেতে পারেন, টকশোতে যেতে পারেন আর ট্রাইব্যুনালে আসতে পারেন না এটা হবে না। কাল না এলে জেরা কোজ।
http://www.dailynayadiganta.com/welcome/post/34898#.UpwGIuI87IU