১০ জুলাই ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা নিজামীর মামলায় আর্গুমেন্ট সমাপ্ত॥ রায় যে কোন দিন : আসামী পক্ষ জবাবদানের সুযোগ পেল না || কুযুক্তি ও কুনজীর দিয়ে কোর্টকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে- তাজুল ইসলাম
২১ নভেম্বর ২০১৩, বৃহস্পতিবার,
বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর আমীর সাবেক মন্ত্রী বিশ্ব বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কার্যক্রম শেষ হয়েছে মর্মে আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এখন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রইল। তবে শেষ দিনে গতকাল সরকার পক্ষ নতুন কিছু খ-িত নজীর উপস্থাপন করার পর আসামী পক্ষ তার জবাব দিতে চাইলে সে সুযোগ দেয়নি ট্রাইব্যুনাল।
মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, কুতর্ক, কুনজীর কুযুক্তি দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে কোর্টকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে প্রসিকিউশন। এই কুযুক্তি দেখিয়ে তারা আসামীর ফাঁসির আবেদন করেছে। যেখানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত সেখানে আসামীপক্ষকে এই নতুনভাবে উপস্থাপিত নজীরের আবেদনের সুযোগ প্রদান ন্যায়-বিচারের স্বার্থেই প্রয়োজন। ট্রাইব্যুনাল তাকে সে সুযোগ না দিয়ে মামলার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেন। আগামীতে যে কোন দিন রায় হবে এই মামলার। আসামী পক্ষকে লিখিত সার সংক্ষেপ জমা দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি ফজলে কবির বলেন, এই পর্যায়ে আসামী পক্ষের মৌখিক জবাবদানের আর কোন সুযোগ আইনে নেই।
চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১এ গতকাল বুধবার সারাদিন সমাপনী আর্গুমেন্ট করেন সরকার পক্ষের আইনজীবীরা। প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, মোহাম্মদ আলী, মীর ইকবাল হোসেন ও তুরিন আফরোজ যুক্তিতর্ক পেশ করেন। এ নিয়ে গতকালসহ সরকার পক্ষ মোট ৫ দিন ১০ সেশন যুক্তিতর্ক পেশ করার সুযোগ পেয়েছে। অপরদিকে আসামীপক্ষ আর্গুমেন্টের সময় পেয়েছে ৪ দিনে ৭ সেশন। অন্যান্য সব মামলায়ই আসামী পক্ষ সরকার পক্ষের তুলনায় বেশি সময় পেলেও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় ঘটেছে উল্টোটা। শুনানি শেষে সরকার পক্ষ দাবি করেন যে ১৬টি অভিযোগের মতে ১৫টি অভিযোগের পক্ষে তারা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ এনেছে। ফলে এই ১০টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে তারা প্রমাণ করতে পেরেছিল বলে দাবি করে আসামীর মৃত্যুদ-ের আবেদন জানান। অপরদিকে আসামী পক্ষ বলেছেন, একটি অভিযোগও প্রমাণ করার মত সাক্ষ্য প্রমাণ তারা আনতে পারেনি। সর্বোচ্চ সাজা তো দূরের কথা এক মিনিটের জন্য সাজা দেয়ার মত সাক্ষ্য প্রমাণও তারা জোগাড় করতে পারেনি। ফলে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বেকসুর খালাস পাবেনÑ এটাই ন্যায় বিচারের দাবি।
গতকাল বুধবার সারাদিন জবাবী আর্গুমেন্ট করেছেন প্রসিকিউশন। একে একে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ হায়দার আলী ও মীর ইকবাল হোসেন আর্গুমেন্ট করেন। তবে যুক্তিহীন ও আইনী বিষয়ের বাইরে ভুল ইংরেজী ও বাংলা মিশ্রিত মোহাম্মদ আলীর আর্গুমেন্টে পুরো এজলাসে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। পর্যাপ্ত ডকুমেন্ট খুঁজে না পাওয়া এবং পড়াশুনা ছাড়া বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্যে অন্যান্য প্রসিকিউটরদেরও লজ্জায় মুখ ঢাকতে দেখা যায়। আবার একে একে উপস্থিত সব প্রসিকিউটর বক্তব্য রাখতে উদ্যত হলে ট্রাইব্যুনালের বিচারকরাই ধমক দিয়ে বলেন, কোর্টের তো একটা ডেকোরাম আছে। আপনারা পেয়েছেন কি? শেষ মুহূর্তে এসে ড. তুরিন আফরোজ দেড় ঘণ্টা আর্গুমেন্ট করেন উস্কানি বিষয়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত ১১, ১২, ১৩, ও ১৪
নম্বর চার্জের উপর। এসব চার্জের উপর গত সোমবার এডভোকেট তাজুল ইসলাম যেসব অকাট্য যুক্তি প্রদর্শনী করেন তা খ-াতে না পেরে চালাকি করে অন্য পন্থা অবলম্বন করেন তুরিন আফরোজ। তিনি বলেন, উস্কানির সাথে গণহত্যার সংযোগ ছাড়া অপরাধ বলে গণ্য হবে না এটা ঠিক নয়। আমাদের আইনে কিছু না থাকলেও ১৮০১ সালের আন্তর্জাতিক আইনে আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি দেশের বাইরের কিছু মামলার নজির তুলে ধরেন। এই বক্তব্য রাখতে রাখতে বিকাল সাড়ে ৪টারও বেশি বেজে যায়। এ সময় আসামীপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, নতুন বিষয় জবাবী আর্গুমেন্টে আনার সুযোগ না থাকলেও আনা হয়েছে। আসামীপক্ষকে এর জবাবদানের সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য তিনি আজ বৃহস্পতিবার আসামীপক্ষের জন্য সময় দেয়ার আবেদন জানান।
তাজুল ইসলাম বলেন, তুরিন আফরোজ যেসব নজির দিয়েছেন তা সবই অংশত সুবিধাজনক জায়গা থেকে কোড করে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। আমাকে সুযোগ দেয়া হোক আমি তার ঐসব নজিরগুলোই পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করে দেখাবো যে এতে আমার পক্ষেরই কথা আছে। আমি নতুন কোন নজির আনব না। তিনি বলেন, যুক্তি-তর্কের জায়গায় আমরা দেখলাম কুতর্ক, কুযুক্তি। মামলা নিয়ে টুইস্ট করা হয়েছে। কুনজির দেখিয়ে আমার মক্কেলের মৃত্যুদ- চাওয়া হয়েছে। যেখানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত সেখানে আসামীপক্ষকে তা খ-নের সুযোগ না দিলে ন্যায়বিচার থেকে আমরা বঞ্চিত হবো। নতুনভাবে রিভিউ দিয়েছে বেআইনীভাবে। এটা তারা দিতে পারেন না। তিনি কোন মামলারই পূর্ণাঙ্গ নজির দেননি, দিয়েছেন কারো স্বচিন্তিত গবেষণাপত্র। এর জবাব দেয়া প্রয়োজন।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি ফজলে কবির বলেন, এ পর্যায়ে মৌখিক জবাবদানের আর কোন সুযোগ আসামীপক্ষের আর নেই। আসামীপক্ষের প্রধান ট্রায়াল ল’য়ার এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, অন্তত ২ ঘণ্টা সময়কাল বরাদ্দ দিলে আমরা তার মধ্যেই জবাব দিতে পারব। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন এবং মামলার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেন। মিজানুল ইসলাম বলেন, আজ সারাদিনই অসত্য কথা শুনলাম। মিথ্যারও তো একটা সীমা থাকা উচিত।
আসামীপক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, এডভোকেট তারিকুল ইসলাম, আসাদ উদ্দিন, হাসানুল বান্না সোহানা, আমিনুল ইসলাম বাপ্পী প্রমুখ। অপরদিকে সরকার পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর আলতাফ উদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুর রহমান, সায়েদুল ইসলাম সুমন, তাপস কান্তি বল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=132505