৩১ মে ২০২০, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
৬টি চার্জ গঠন করে আদেশ প্রদানের পর কোর্টের জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন- আজহার || সব অভিযোগ মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত
১৩ নভেম্বর ২০১৩, বুধবার,
১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ আনীত ৬টি অভিযোগই অনুমোদন করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দিয়েছেন। আগামী ৫ ডিসেম্বর সূচনা বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে এই মামলার কার্যক্রম শুরুরও নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
পূর্বনির্ধারিত চার্জ গঠনের আদেশ প্রদানের দিন থাকায় গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে আজহারুল ইসলামকে গতকাল সকালে নিয়ে আসা হয় পুরাতন হাইকোর্টস্থ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-১  গতকাল সকালে এই আদেশ দেয়ার পর কোর্ট “তিনি দোষী না নির্দোষ” জানতে চাইলে আজহার বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার বিরুদ্ধে বিগত ৪২ বছরে কোন অভিযোগ আনা হয়নি। জামায়াতে ইসলামী না করলে আজ আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হতো না।
হরতালের কারণে সিনিয়র আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে তরুণ এডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন, রায়হান উদ্দিন, তারিকুল ইসলাম ও আসাদ উদ্দিন আসামী পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন। ওদিকে গতকালও আজহারুল ইসলামকে কোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখা হলে আইনজীবীরা কারণ জানতে চান। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, বিচারকদের এজলাসে আসা এবং যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে সম্মান করা আদালতের সাধারণ প্র্যাকটিস। এটা আজহারুল ইসলাম করেননি। এজন্যই তার চেয়ার সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এডভোকেট তারিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আগে জানলে আমরা আগেই তাকে সতর্ক করতে পারতাম। যদি তিনি এরূপ করে থাকেন তাহলে আমরা ক্ষমা চাই। ভবিষ্যতে যাতে এরূপ আর না হয় সেটা আমরা তাকে বলবো। পরে চেয়ারম্যান বলেন, ঠিক আছে আগামী দিন থেকে চেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। এডভোকেট তারিকুল ইসলাম পরে সাংবাদিকদের বলেন, বিচারকরা কোর্টে ওঠা এবং নামার সময় এটিএম আজহার দাঁড়িয়ে কোর্টকে সম্মান করেননি এমন অভিযোগ সত্য নয়। আমরা কোর্ট শেষে আজহার সাহেবকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেন, “এ যাবত আমাকে কাঠগড়ায় আনাই হয়েছে কোর্ট ওঠার পরে। আর নামানো হয়েছে কোর্ট বসা থাকা অবস্থায়। সুতরাং আমি কোর্টকে অসম্মান জানানোরই বা সুযোগ পেলাম কখন? এই অভিযোগ সত্য নয়।”
এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে ৯ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) রয়েছে। তাকে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও গুরুতর জখম এরূপ ৯ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২২৫ জনকে গণহত্যা, ৪ জনকে হত্যা, ১ জনকে ধর্ষণ, ১৭ জনকে অপহরণ, ১৩ জনকে আটক ও নির্যাতন এবং শত শত বাড়ি-ঘরে লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ এর ৩(২)/ এ, ৩(২)/ সি, ৩(২)/ ডি, ৩(২)/ জি ও ৩(২)/ এইচ এবং ৪/১ ও ৪/২ ধারা (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) মোতাবেক এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের সময়সীমা একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত।
এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, রংপুরের কারমাইকেল কলেজের একাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র থাকাকালে এটিএম আজহারুল ইসলাম জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের রংপুর শাখার সভাপতি ও ওই জেলার আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র ও তা বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকে অপরাধ সংঘটন করেন তিনি। রংপুর ক্যান্টনমেন্টে যাতায়াতের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন।
১নং অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাসানী (ন্যাপ) নেতা ও রংপুর শহরের বিশিষ্ট আয়কর আইনজীবী এ ওয়াই মাহফুজ আলীসহ ১১ জনকে অপহরণ, আটক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাদের ৩ এপ্রিল রংপুর শহরের দখিগঞ্জ শশ্মানে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে গণহত্যা চালানো হয়।
২নং অভিযোগে বলা হয়, আসামী একাত্তরের ১৬ এপ্রিল তার নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জ থানার ধাপপাড়ায় ১৫ জন নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলী করে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করেন।
৩নং অভিযোগে বলা হয়, এ আসামী একই বছরের ১৭ এপ্রিল নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ারবিল এলাকায় এক হাজার ২০০’র বেশি নিরীহ লোক ধরে নিয়ে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করেন।
৪নং অভিযোগে বলা হয়, ১৭ এপ্রিল কারমাইকেল কলেজের চারজন অধ্যাপক ও একজন অধ্যাপক পত্মীকে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে অপহরণ করে দমদম ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলী করে হত্যা করেন।
৫নং অভিযোগে বলা হয়, ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মহিলাদের ধরে এনে টাউন হলে আটকে রেখে ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতন চালান। একই সঙ্গে মহিলাসহ নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিদের অপহরণ, আটক, নির্যাতন, গুরুতর জখম, হত্যা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এ আসামী।
৬নং অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের নবেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায় একজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর রংপুর শহরের বেতপট্টি থেকে একজনকে অপহরণ করে রংপুর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে নিয়ে আটক রেখে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন ও গুরুতর জখম করেন।
এর আগে গত ৮ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ৯ জুলাই এ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেয়া হয়। এর ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
আদেশ প্রদানের শুরুতেই ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, আদেশটি বেশ লম্বা। আমরা সংক্ষেপে শুধু অভিযোগের অংশ পড়ছি। অভিযোগ পড়ে শুনানোর পর আজহারুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, আপনি দোষী না নির্দোষ?
জবাবে আজহার বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার বিরুদ্ধে বিগত ৪২ বছরে কোন অভিযোগ আনা হয়নি। জামায়াতে ইসলামী না করলে আজ আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হতো না। তিনি আরো বলেন, আমাকে গ্রেফতার করা হয় ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১২টি মামলায় জড়িয়ে আমাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসার নামে চরম নির্যাতন করা হয়। এই সব মামলায় জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আমার বিরুদ্ধে এই কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয় যাতে আমি জামিন না পাই। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যেমন অসত্য তেমনি আজকের আদেশও ভিত্তিহীন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর আদেশে গত বছরের ২২ আগস্ট মগবাজারস্থ আজহারের নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় আজহারুল ইসলামকে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=131927