১০ জুলাই ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতেই বললেন মিজানুল ইসলাম বেআইনীভাবে রেকর্ডকৃত মামলার কোন কার্যক্রমই বৈধ হতে পারেনা
৮ নভেম্বর ২০১৩, শুক্রবার,
মাওলানা নিজামী
* ১৯৭১ সালে সেনা ক্যাম্পে মুরগি সরবরাহকারী শা. কবিরের কথা বিশ্বাস করলে আইন-আদালত থাকে না
* এই মামলার উৎস, অনুসন্ধান, পরিকল্পনা সবই হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার পক্ষের আর্গুমেন্ট বা চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে। গত রোববার থেকে বুধবার পর্যন্তু ৪ দিন যুক্তি উপস্থাপন করেন সরকার পক্ষে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী ও ড. তুরিন আফরোজ। গতকাল সকাল-বিকাল দুই বেলা আর্গুমেন্ট করেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। গতকালের আর্গুমেন্টে তিনি উল্লেখ করেন যে, মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মামলা শুরুই হয়েছে বেআইনীভাবে। সিআরপিসির মামলা গ্রহণ বা স্থানান্তরের কোন সুযোগ বিচারকদের না থাকলেও এই মামলার ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে। এই মামলার উৎস, অনুসন্ধান, পরিকল্পনা সবই হয়েছে আদালতের বাইরে থেকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এই মামলাটি যে প্রক্রিয়ায় রেকর্ড হয়েছে তা যেহেতু বেআইনী তাই এই মামলার কোন কার্যক্রমই বৈধ নয়। তিনি আরো বলেন, ১৯৭১ সালে সেনা ক্যাম্পে মুরগি সরবরাহের অভিযোগে অভিযুক্ত শাহরিয়ার কবিরের কথা বিশ্বাস করলে দেশে আইন-আদালত বলে কিছু থাকতে পারে না।
বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলছে আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলা। সরকার পক্ষের কৌসুলী, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সীমন, মীর ইকবাল হোসেন, আলতাফ উদ্দিন, আবুল কালাম প্রমুখ আর্গুমেন্টের সময় উপস্থিত ছিলেন। আর্গুমেন্টের পুরো সময় জুড়েই মাওলানা নিজামী ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপবিষ্ট ছিলেন। মিজানুল ইসলামকে আর্গুমেন্টে সহায়তা করেন এডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, তারিকুল ইসলাম, হাসানুল বান্না সোহাগ প্রমুখ। আগামী রোববার আরো আর্গুমেন্ট করবেন আসামী পক্ষ।
এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে চলমান মামলার মূল ভিত্তি হলো নালিশী দরখাস্ত আর তদন্ত রিপোর্ট। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এর কোনটিই আমরা পাইনি। ফলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে মামলায় মক্কেলকে সহযোগিতা করা সহজ নয়।
তিনি বলেন, অভিযোগে উল্লেখ করা হলেও তারা এমন কোন ডকুমেন্ট দাখিল করতে পারেনি যার মাধ্যমে প্রমাণ হতে পারে যে নিজামী সাহেব ১৯৭১ পাকিস্তান আর্মির সাথে বসে ষড়যন্ত্র করেছেন। এই অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট। ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্তু তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন এবং অখ- পাকিস্তানের ধারণায় বিশ্বাসী একজন ছাত্রনেতা ছিলেন সত্য। তবে তার কার্যক্রম ছিল একেবারেই রাজনৈতিক। তিনি আল-বদর বাহিনীর প্রধান বা এরূপ কোন বাহিনীর কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন না। প্রসিকিউশনের এই অভিযোগ প্রমাণ করতে তারা কোন দালিলিক প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। ১৯৮৬ সাল পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর নিজামী সাহেবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু হয়। যাদের মাধ্যমে এই অপপ্রচার শুরু হয় তাদের একজন হলেন বর্তমান আইন মন্ত্রী শফিক আহমেদ আরেকজন হলেন মাওলানা নিজামীর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। নিজামী সাহেবকে আল-বদর প্রধান হিসেবে উল্লেখ করে আবু সাইয়িদ সাহেব যে বই লিখেছেন তাতে জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত শাহরিয়ার কবিরের একটি লেখার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে যাতে কোন রেফারেন্স নেই।
মিজানুল ইসলাম বলেন, ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং গ্রেফতার করা হয়। তরিকত ফেডারেশনের নেতা রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়েরকৃত একটি সি আর মামলায় তাকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। পরে কেরানীগঞ্জ, পল্লবী ও রাজশাহীর মতিহার থানার মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয় এবং গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়। এসব মামলা কিভাবে ট্রাইব্যুনালে আসলো তা বোধগম্য নয়। আইনসঙ্গত এমন কোন ভিত্তি নেই যার মাধ্যমে সিআর মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা যায়। জজ সাহেবদের এরূপ কোন এখতিয়ার দেয়া হয়নি। এসময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ২০১০ সালে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে এই মামলাগুলো সমানে ট্রাইব্যুনালে আসতে থাকে আমরা এগুলো না দেখেই তদন্ত সংস্থায় পাঠিয়ে দিয়েছি। কি কি মামলা এসেছে তার কোন রেকর্ড আমাদের কাছে নেই। মিজানুল ইসলাম বলেন, আপনারা ভুলভাবে মামলাগুলো তদন্ত সংস্থায় পাঠিয়েছেন।
তিনি বলেন, মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মামলা শুরুই হয়েছে বেঅইনীভাবে। সিআরপিসির মামলা গ্রহণ বা স্থানান্তরের কোন সুযোগ বিচারকদের না থাকলেও এই মামলার ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে। এই মামলার উৎস, অনুসন্ধান, পরিকল্পনা সবই হয়েছে আদালতের বাইরে থেকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এই মামলাটি যে প্রক্রিয়ায় রেকর্ড হয়েছে তা যেহেতু বেআইনী তাই এই মামলার কোন কার্যক্রমই বৈধ নয়। যার   ভিত্তিতে মামলা হলো তাতে ১২ জন আসামীর নাম ছিল। কিন্তু তা থেকে এই মামলার আসামী করা হলো মাত্র ৪ জনকে। এই ৪ জনই হলেন একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। এতে স্পষ্ট যে, সরকারের নির্দেশনামতে রাজনৈতিক কারণে এই মামলা সৃষ্টি করা হয়েছে। ২১/৭/২০১০ তারিখে নালিশ রেকর্ড করার পরের দিনই তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন জানানো হয়। আবেদনে বলা হলো যে, তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন, তিনি ’৭১ সালের দৈনিক সংগ্রামের দু’টি পত্রিকা এবং ’৭১ এর ঘাতকেরা কে কোথায় বই পড়ে প্রাথমিকভাবে জানতে পারেন। তার ভিত্তিতেই ঐ আবেদন জানানো হয়েছিল। অথচ এই দুটি পত্রিকা ও বই তিনি জব্দ করেছেন ১৫/৫/১১ তারিখে এবং আরো পরের অন্য একটি তারিখে। তাহলে প্রশ্ন হলো দেড়/দুই বছর পরে জব্দকৃত ডকুমেন্ট তিনি দুই বছর আগে দেখলেন কিভাবে। এ থেকে বোঝা যায়, এই মামলার উৎস, অনুসন্ধান, পরিকল্পনা সবই হয়েছে আদালতের বাইরে থেকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং বেআইনীভাবে।
এডভোকেট মিজান বলেন, ফর্মাল চার্জ এই মামলার ভিত্তি। সেখানেও মনে যা এসেছে তাই লেখা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের মন্ত্রিসভায় ২ জন বাঙ্গালী থাকলেও কোন বাঙ্গালী ছিল না বলে মিথ্যাচার করা হয়েছে। অক্সিলারী ফোর্সের গঠন কখন কোথায় হয়েছে তা নিয়ে চার ধরনের তথ্য দেয়া হয়েছে। এর কোনটা সত্য?  অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্তু মতিউর রহমান নিজামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন তারপরে ছিলেন মুজাহিদ সাহেব। এজন্যই হয়তো বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ নিজামী সাহেবের বিরুদ্ধে প্রথমে প্রসিকিউশন আনেনি। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল নিজে এনেছে এই অভিযোগ যা প্রমাণ করতে কোন ডকুমেন্টই তারা দাখিল করতে পারেনি।
তিনি আরো বলেন, সরকার পক্ষের ১নং সাক্ষী মিছবাহুর রহমান চৌধুরী এক নাগাড়ে অসত্য কথা বলেছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সৌদি বাদশার সাথে দেখা করেছেন এবং সেখানে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবও ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। অথচ গোলাম আযম সাহেব ঐ বছর সৌদি আরব যাননি। এটা তার নিজের লেখা “জীবনে যা দেখলাম” বইতেই রয়েছে। তিনি যখন সৌদি বাদশাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন তখন গোলাম আযমসহ আরো অনেকে ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন যা বাস্তবসম্মত নয়। ইসলামী ছাত্রসংঘের কার্যক্রম ও নেতৃত্ব সম্পর্কেও তিনি অসত্য কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের নিবন্ধন সম্পর্কে তিনি অসত্য কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন আছে। অথচ রেকর্ডে দেখা যায় যে, তার দলের নিবন্ধন দেয়া হয়নি মর্মে আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এটা পেন্ডিং নয়। সিরাজুল ইসলাম মতলিব ইসলামী ছাত্রসংঘের মৌলবীবাজার জেলার সভাপতি মর্মে কথিত চিঠিতে উল্লেখ আছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে কি মৌলভীবাজার জেলা ছিল? কথিত চিঠিটি যে লিখেছে তাকে এই মামলায় সাক্ষী করা হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি ঐ চিঠি তার লেখা নয় বলে জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে এক্সপার্ট মতামতও নেয়া হয়নি। অরিজিনাল চিঠিটি এডভোকেট নুরুল ইসলামের কাছে আছে মর্মে বলা হলেও মিছবাহ সাহেব তদন্ত কর্মকর্তাকে এই নুরুল ইসলামের ঠিকানা দেননি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ৬ বার করে ঠিকানা দিতে চেয়েও তিনি দেননি।
মিজানুল ইসলাম ডকুমেন্ট দেখিয়ে বলেন, মৌলভীবাজারের ইতিহাস বই এবং মৌলবীবাজার মহকুমার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত “শতাব্দী” স্মরণিকা গ্রন্থে মিছবাহুর রহমান চৌধুরী এবং তার পিতা আব্দুর রহমান চৌধুরী ওরফে ছানা মিয়াকে পিস কমিটির সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।
মিজানুল ইসলাম বলেন, ভ্যানগার্ড অফ ইসলামিক রিভলুশন বইটি প্রসিকিউশন এক্সিবিট করেছে। এতে যে বইয়ের রেফারেন্স দেয়া হয়েছে তার মূল উর্দু বই এবং অনুবাদ গ্রন্থ আমরা জমা দিয়েছি । তাতে কোথায়ও আল-বদর বাহিনী প্রধান হিসেবে মতিউর রহমান নিজামীকে উল্লেখ করা হয়নি। অথচ অসততার সাথে সেখানে নিজামী সাহেবের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বইয়ে শাহরিয়ার কবির লিখেছেন শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং হাজার হাজার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নষ্ট করেছেন। অথচ আওয়ামী লীগ বলে, ধর্মনিরপেক্ষতা আর ধর্মহীনতা এক নয়। এই লোকটার কথা বিশ্বাস করলে আইন আদালত বলে কিছু থাকবে না।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=131501