১১ আগস্ট ২০২০, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মৃত্যুদন্ডাদেশের বিরুদ্ধে মুজাহিদের আপিল: বিচারিক সীমা অতিক্রম করা হয়েছে এই রায়ে -তাজুল ইসলাম
১২ আগস্ট ২০১৩, সোমবার,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মৃত্যুদ-াদেশ দিয়ে যে রায় দিয়েছে তার বিরুদ্ধে বেকসুর খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করা হয়েছে। মুজাহিদের পক্ষে তার আইনজীবী এডভোকেট জয়নুল আবেদীন তুহিন গতকাল রোববার সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসে এই আপিল জমা দেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দায়েরকৃত এই আপিলের নম্বর হলো ১০৩/২০১৩। যাতে ৩৮০০ পৃষ্ঠার ডকুমেন্টসহ ৯৫ পৃষ্ঠার মূল আপিল দায়েরের পর এডভোকেট তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আপিলের ১১৫টি গ্রাউন্ড রয়েছে। আইসিটি-২ মুজাহিদকে যে গ্রাউন্ডে মৃত্যুদ- দিয়েছে ঐ গ্রাউন্ডে মৃত্যদ- তো দূরের কথা এক ঘণ্টার জন্যও শাস্তি দেয়া যায় না। এটা নজীরবিহীন ঘটনা। বিচারকরা তাদের এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয়ে অবজার্ভেশন দিয়েছেন। আশা করি উচ্চ আদালতে আমরা ন্যায় বিচার পাবো।
গত ১৭ জুলাই ২০১৩ ইং তারিখে বিচারপতি ওবাইদুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত কথিত মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- প্রদান করে।
তাজুল ইসলাম এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনীত ৭টি অভিযোগের মোট ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে ট্রাইব্যুনাল-২ যে রায় প্রদান করেছেন, সে রায় ন্যায়ভ্রষ্ট উল্লেখ করে আমরা আজ সুপ্রীমকোর্টে আপিল দায়ের করেছি। আপিলে মোট ১১৫টি গ্রাউন্ড নেয়া হয়েছে।
তাজুল ইসলাম ঐ ৫টি অভিযোগ সম্পর্কে সংক্ষেপে নি¤œলিখিত গ্রাউন্ড উল্লেখ করেনÑ
চার্জ-১ (সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ’)
প্রথম অভিযোগে মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ এই অভিযোগের সাক্ষী সিরাজুদ্দিন হোসেনের ছেলে জেরায় নিজেই স্বীকার করেছেন, তার পিতাকে অপহরণের পরপর তিনি ১৯৭২ সালে রমনা থানায় দালাল আইনে একটি মামলা করেছিলেন। ঐ মামলায় তিনি সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন। এই মামলায় আসামী জনৈক খলিল স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী দিয়েছিল এবং বিচারে তাদের যাবত জীবন কারাদ- হয়। তারপরও ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। আইনের দৃষ্টিতে এটা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ঐ মামলায় আসামী হিসেবে মুজাহিদের নাম ছিল না।
চার্জ-৩ (রঞ্জিত কুমার নাথকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ’)
৩য় অভিযোগে মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফরিদপুরের জনৈক মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জিত কুমার নাথকে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। অথচ এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্পষ্ট করেই তার জেরায় স্বীকার করেছেন যে, রঞ্জিত নাথকে নিগৃহীত করার ঘটনা তার জব্দকৃত কোন বইয়ে উল্লেখ ছিল না। ফরিদপুর জেলা প্রশাসন থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং বধ্যভূমির তালিকাসহ নিহত ব্যক্তিদের যে তালিকাটি সংগ্রহ করেছিলেন সেই তালিকায়ও রঞ্জিত নাথের নাম নেই। আর সাক্ষীর জবানবন্দীতেও মুজাহিদের দায় প্রমানিত না হলেও ট্রাইবুনাল তাকে এই অপরাধে ৫ বছরের কারাদ- প্রদান করেছেন যা আমাদের মতে সঠিক হয়নি।
চার্জ-৫ (পুরাতন এমপি হোস্টেলে বন্দী নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ’)
৫ম অভিযোগে নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলে বেশ কয়েকজন বন্দীকে নির্যাতন করে হত্যার দায়ে মুজাহিদকে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা হয়। এই অভিযোগের পক্ষে প্রসিকিউশন সাক্ষী তার জেরায় বলেছেন, ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট সকালে পত্রিকায় কিছু ব্যক্তিদের আটকের খবর পেয়ে ঐ দিনই বিকেলে তিনি তার চাচার সাথে রমনা থানায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে গিয়ে বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদ, আলতাফ মাহমুদসহ আরো ২০/২৫ জনকে দেখেছিলেন। অথচ প্রসিকিউশন কর্তৃক সরবরাহকৃত জাহানারা ইমামের নিজের লেখা বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে জানা যায়, উপরোক্তদের কেউই ৩০ আগস্ট মধ্যরাতের আগে গ্রেফতার হয়নি। এইভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী একজন ব্যক্তির সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মুজাহিদকে দোষী সাব্যস্ত করা অন্যায্য এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
চার্জ-৬ (মোহাম্মাদপুর ফিজিক্যালে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ’)
৬ষ্ঠ অভিযোগে মুজাহিদের বিরুদ্ধে ঢাকার মোহাম্মাদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ আনা হয়। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ মুজাহিদের বিরু্েদ্ধ সুস্পষ্ট কোন অভিযোগ আনতে ব্যর্থ হয়েছে। মুজাহিদ কতজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছেন তাদের কোন সংখ্যা নেই। সেই সব বুদ্ধিজীবীদের নামও নেই। কোনদিন এবং কোথায় তাদেরকে হত্যা করেছে তারও কোন বিবরণ নেই। বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের কোন লোক সাক্ষী দিতে আসেননি। অথচ বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সিরাজুদ্দিন হোসেনের হত্যাকা-কে রাষ্ট্রপক্ষ একটি আলাদা হত্যাকা- হিসেবে অভিযোগ এনেছে। ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে সিরাজুদ্দিন সাহেবের হত্যাকে জড়িত করা হয়নি।
চার্জ-৭ (ফরিদপুরের বাকচরে হত্যাকা- চালানোর অভিযোগ’)
৭ম অভিযোগে ফরিদপুরের বাকচরে হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ আনা হয়। এই অভিযোগের পক্ষে একজনই সাক্ষী শোনা সাক্ষী। আর আরেকজন বর্তমানে ভারতে থাকলেও ট্রাইবুনালে এসে বাংলাদেশে থাকার দাবী করেন। সাক্ষী শক্তি সাহা তার পিতার হত্যার বিচার চেয়ে ট্রাইবুনালে সাক্ষী দিলেও জেরার এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশে তার সুদীর্ঘকাল অবস্থান কালে তিনি তার বাবার হত্যার ব্যাপারে কোন থানায় বা আদালতে কোন অভিযোগ দায়ের করেননি। তার বড় ভাই ফরিদপুরেই আছেন। সেই ভাই তার বাবার মৃত্যু সংক্রান্তে কোন মামলা করেছেন কি না তার জানা নেই বা এ মর্মে তিনি কিছু শোনেনওনি, কারণ তার আগ্রহ ছিল না। অথচ এই ধরনের অগ্রহণযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে জনাব মুজাহিদকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। শুধু তাকে দোষী সাব্যস্ত করাই হয়নি মৃত্যুদ-ও দেয়া হয়েছে। এতে আমরা বিস্মিত। এটা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।
উল্লেখ্য ২ এবং ৪নং অভিযোগ থেকে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে খালাস দেয়া হয়।
তাজুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো- এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তার জেরায় পরিষ্কারভাবে স্বীকার করেছেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত মুজাহিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার কোন থানায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোন অপরাধের জন্য কোন মামলা হয়েছে, এমন তথ্য তিনি তার তদন্তে পাননি। তদন্তকারী কর্মকর্তা এটাও স্বীকার করেছেন যে, মুজাহিদ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস বা এই ধরনের কোন সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। তারপরও ট্রাইব্যুনাল তাকে আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটা সত্য কথা যে মুজাহিদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এবং পরবর্তীকালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তিনি আলবদরের সদস্য ছিলেন বা আলবদরের কমান্ডার ছিলেন এমন কোন সাক্ষ্য প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা মনে করি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধের কোন উপাদান নেই। আইনের দৃষ্টিতে ট্রাইব্যুনালের এ রায় কোন রায়ই নয়। উচ্চ আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পাব বলে আশা করি।
সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তাজুল ইসলাম আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন আখ্যায়িত করে ট্রাইব্যুনাল যে অবজার্ভেশন দিয়েছে তাতে বিচারকরা তাদের বিচারিক সীমা অতিক্রম করেছেন। কারণ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এই মামলায় কোন অভিযোগ আনা হয়নি, অভিাযোগের বিরুদ্ধে জামায়াত দল হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও কোন আইনী সুযোগ পায়নি। এই রায় বাতিলযোগ্য।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=12423