২৮ মে ২০২০, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
ফাঁসির সেলে কেমন আছেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ - মতিউর রহমান আকন্দ
৩১ জুলাই ২০১৩, বুধবার,
জনাব আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পরিচিত নাম। এক সংগ্রামী পুরুষ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬ মেয়াদে) তিনি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতা ও সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল। অসহায় বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পঙ্গু মানুষের জন্য তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংগঠনেরও দায়িত্ব পালন করেছেন আন্তরিকভাবে। সকল কাজেই তিনি স্বচ্ছতা ও বলিষ্ঠতার  পরিচয় দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-২ তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মিথ্যা, ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফাঁসির আদেশ দিয়েছে। মৃত্যুদ- মাথায় নিয়ে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির সেলে দিন যাপন করছেন। পবিত্র রমযান মাসে রোজা রাখা অবস্থায় ফাঁসির প্রকোষ্ঠে বন্দী জীবন চলছে তার। মাননীয় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ফাঁসির আদেশের পর তাকে ফাঁসির পোশাক পরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাকে রাখা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি ফাঁসির সেলে। তার পাশেই আরো ৭টি সেল। অদূরেই ফাঁসির মঞ্চ।

তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত ফাঁসির আদেশ বাতিলের জন্য মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে আপীল প্রস্তুতি চলছে। আপীল প্রস্তুতির দিকনির্দেশনা, পরামর্শের জন্য আমরা ডিফেন্স টীমের আইনজীবীগণ তার সাথে সাক্ষাতের জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়েছিলাম। ফাঁসির পোশাকে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় তাকে আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কারাগারের নির্দিষ্ট ফতুয়া, পায়জামা ও মাথায় টুপি পরিহিত অবস্থায় তাকে মনে হচ্ছিল ইসলামী আন্দোলনের একজন লড়াকু সৈনিক। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ইমরান-এ-সিদ্দিকী ও আমিসহ আমরা ৩ জন আইনজীবী তার নিকট থেকে মামলার আপীল প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা গ্রহণ করি। তিনি মামলার বিভিন্ন দিক, আইনী বিষয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেন। আইনী প্রস্তুতি নিয়ে সত্যের পথে লড়াই করার জন্য তিনি উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, সত্য এবং মিথ্যার লড়াইয়ে সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

ফাঁসির আদেশের পর ২২ জুলাই ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার শুনানিকালে বিশেষ আদালতে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেদিন তাকে দেখেছি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। ফাঁসির দ-ে তিনি মোটেই বিচলিত নন। তিনি মনের দিক থেকে অত্যন্ত মজবুত ও বলিষ্ঠ। আজ কারাগারে তার সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়। আইনী বিষয়ে পরামর্শের পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উচ্চারণ করলেন, “আমাকে যে অভিযোগে ফাঁসির আদেশসহ বিভিন্ন দ- দেয়া হয়েছে তার সাথে আমার দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগই সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি আমার বিবেকের কাছে পরিষ্কার আমি কোন অপরাধ করিনি। মহান রাব্বুল আলামীন অবশ্যই সব খবর রাখেন। দুনিয়ার আদালত আমার উপর যে জুলুম করেছে শেষ বিচারের দিনে সকল বিচারকের বিচারক মহান রাব্বুল আলামীন তার বিচার করবেন।” তিনি বলেন, “আমি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীদের প্রদত্ত জবানবন্দী, জেরা ও আরগুমেন্ট অত্যন্ত মনোযোগের সাথে শুনেছি। আমাকে ঐসব মিথ্যা অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার কোন সুযোগ নেই। প্রসিকিউশন আমার বিরুদ্ধে আনীত কোন অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোন অপরাধের কিংবা আমার আল-বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-শামস বা এই ধরনের কোন সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ততা ছিল এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এর পরও মাননীয় ট্রাইব্যুনাল আমাকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেছেন। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।”

জনাব মুজাহিদ বলেন, “প্রতিদিন বাংলাদেশে শত শত লোক স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এসব মৃত্যুর সাথে ফাঁসির আদেশের কোন সম্পর্ক নেই। কখন, কার, কিভাবে মৃত্যু হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেন। আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোন সাধ্য কারো নেই। সুতরাং ফাঁসির আদেশে কিছু যায় আসে না। আমি মৃত্যুদ-ের ঘোষণায় উদ্বিগ্ন নই।”

তিনি বললেন, “অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা গোটা মানব জাতিকে হত্যা করার শামিল। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে তার জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি আল্লাহর দ্বীনের উদ্দেশ্যে আমার জীবন কুরবান করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত আছি।”

জনাব মুজাহিদ বলেন, “মৃত্যুদ-ের ভয়ে কোন ধরনের আপোস- সমঝোতা করে বের হয়ে জেল গেটে যদি আমার মৃত্যু হয়, তা হবে অপমানের মৃত্যু। আমি সেই অপমান ও কাপুরুষের মৃত্যু চাই না। আমি শাহাদাতের গৌরবান্বিত মৃত্যু কামনা করি।” 

জনাব মুজাহিদ আরও বললেন, “আমার অপরাধ আমি ইসলামী আন্দোলন করি। দুনিয়ার ইতিহাসে যারাই ইসলামী আন্দোলন করেছেন তারাই জুলুমের শিকার হয়েছেন। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর যে জুলুম নির্যাতন চালানো হয়েছে আমি তারই শিকার। তবে অতীতে আল্লাহর পথের সৈনিকদের উপর যে অত্যাচার হয়েছে সে তুলনায় আমার উপর এ নির্যাতন কিছুই নয়।”

তিনি মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের সূরা বুরুজের ৮নং আয়াত উচ্চারণ করে বললেন, “ওদের এ জন্যই শাস্তি দেয়া হয়েছিল যে, তারা মহাপরাক্রমশালী স্বপ্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।” তিনি বললেন, “আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার কারণে যদি আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে আমি শহীদি মৃত্যুবরণ করবো। প্রতিটি প্রাণীর জন্য মৃত্যু অবধারিত। স্বাভাবিক মৃত্যুর মাঝে কোন গৌরব নেই। শহীদি মৃত্যু হচ্ছে গৌরবের মৃত্যু। নবী করিম (সাঃ) ও আসহাবে রাসূলগণ শহীদি মৃত্যু কামনা করেছেন। ইসলামী আন্দোলন ছাড়া শহীদি মৃত্যুর অন্য কোন পথ নেই। এ আন্দোলনের একজন সৈনিক হিসেবে আমার যদি শাহাদাত নসিব হয় তাহলে নিঃসন্দেহে আমার জীবন সার্থক হবে। আমি শহীদি মৃত্যু কামনা করি।”

জনাব মুজাহিদ এসময় ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের খোঁজখবর নেন। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “জেলখানায় আমার জন্য নির্ধারিত পত্রিকা পাঠ করে জানতে পাচ্ছি, পবিত্র রমযান মাসেও এ জালেম সরকার ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের গ্রেফতার করছে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে।”

তিনি বললেন,“আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলার রায় ঘোষণার আগে ও পরে, জামায়াত ঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে ১০ জন লোক শহীদ হয়েছে। আমি মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট তাদের শাহাদাত কবুলিয়াতের জন্য দোয়া করি। আমি ঐসব শহীদ পরিবারের কথা ভাবি- যাদের সন্তানরা দ্বীনের জন্য, অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাদের ধৈর্য্য ধারনের তাওফিক দিন। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তায়ালা তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।”

জনাব মুজাহিদ আপীল মামলার প্রস্তুতির দিকনির্দেশনার পর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন, “আমি দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। আমি অন্যায়ের কাছে কখনো আপোস করিনি। পার্থিব স্বার্থের জন্যও আমি কখনো লালায়িত ছিলাম না। আল্লাহ সাক্ষী, আমি গণতন্ত্র ও মানবকল্যাণে আমার যোগ্যতা উৎসর্গ করেছি।”

তার এ বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে সত্য। তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৮২-৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা ইতিহাস থেকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। এ আন্দোলনে তিনি লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তার অবদান অনস্বীকার্য। লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বাসায় অনেকবার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। আন্দোলনের রূপরেখা ও কর্মসূচি প্রণয়নে তিনি নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছেন।

ওয়ান ইলেভেনের পর গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তার ভূমিকা কারো অজানা নয়। তিনি চারদলীয় জোটকে নির্বাচনমুখী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

জনাব মুজাহিদ তার অতীত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রসঙ্গ আসতেই বললেন, “আমি যা করেছি দেশের মঙ্গলের জন্যই করেছি। দেশের ক্ষতি হয়, গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয় এমন ভূমিকা আমি কখনো পালন করিনি।”

জনাব মুজাহিদ বললেন, “আমি আমার নিজের জীবন নিয়ে ভাবি না। আমি চিন্তিত দেশের ভবিষ্যত নিয়ে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ আজ তাদের ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তিনি বললেন, বিচার বিভাগের যে করুণ অবস্থা আমি দেখছি তাতে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। ন্যায়বিচার আজ তিরোহিত। আদালতের উপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে গেলে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবি।”

তিনি আরো বললেন, “এদেশের ভবিষ্যৎ ইসলাম। ইসলাম ছাড়া মুক্তির আর কোন পথ নেই। তাই ইসলামের সুমহান আদর্শের আলোকে দেশের প্রতিটি নাগরিককে উদ্ভাসিত করতে হবে। ইসলামী আদর্শের কোন পরাজয় নেই। এ আদর্শের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের উপর যত জুলুম, নির্যাতন হয়েছে এ আন্দোলন তত বেগবান হয়েছে। অত্যাচারী জালেমদেরই পতন হয়েছে।”

তিনি জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের উপর সাম্প্রতিক নির্যাতনের ঘটনা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে অবগত হয়ে বললেন, “যে দেশের নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধরা ইসলামের জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয় সেদেশে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হবে। ইনশাআল্লাহ।”

জনাব মুজাহিদ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ত্যাগ, কোরবানী ও শাহাদাতের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বললেন, “সংগঠনের প্রতিটি কর্মী সম্মান, শ্রদ্ধা ও মর্যাদার পাত্র। আমি তাদের সম্মান করি। কারাগারের লৌহপিঞ্জরে আবদ্ধ থেকে তাদের গৌরবজনক ভূমিকা দেখে আমি সত্যিই উদ্দীপ্ত।” তিনি আইনজীবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, “আমি আমার আইনজীবীদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের নিরলস পরিশ্রম, নিষ্ঠা, আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ আইনজীবীগণ মিথ্যা প্রমাণে সক্ষম হয়েছেন। সাক্ষীদের জেরা করে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করেছেন অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। তারপরও আমার মৃত্যুদ- হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি মহামান্য সুপ্রীমকোর্টে আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হবে এবং আমি জনগণের মাঝে ফিরে যাবো ইনশাআল্লাহ।”

তিনি দেশবাসীকে সালাম জানান এবং দোয়া করতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি সকল জুলুমের অবসান ঘটবে, এ জালেম সরকারের পতন হবে এবং দেশবাসী মুক্তি পাবে।”
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=123346