৩১ মে ২০২০, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে ১৫ নং সাক্ষীর সাক্ষ্যে নানা অসঙ্গতি: ’৭১ সালে শহীদ পিতার ’৭৬ সাল পর্যন্তু সন্তান হয়েছে!
২৫ জুলাই ২০১৩, বৃহস্পতিবার,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের ১৫ নং সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন পাবনার বৃশালিকা গ্রামের আমিনুল ইসলাম প্রামাণিক। আগামী ১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষীর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আমিনুলের পিতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন মর্মে তিনি এবং ইতঃপূর্বে তার ভাই আব্দুস সেলিম লতিফ দাবি করলেও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নাম নেই। আমিনুল তার নিজের বয়স ৪৫/৪৬ দাবি করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র এবং এসএসসি রেজিস্ট্রেশনে জন্ম তারিখ আছে ১৯৭২ সাল । তার বোন নাজমা আক্তার বেলীর জন্ম তারিখ ১৫ ডিসেম্ব ১৯৭৩ এবং অপর বোন সোরাইয়া সোহরাবের জন্ম তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৬ । সেক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, ১৯৭১ সালে পিতা শহীদ হয়ে থাকলে স্বাধীনতার পরে ৩ ছেলে-মেয়ের জন্ম হলো কিভাবে।
মাওলানা নিজামীর উপস্থিতিতে গতকাল বুধবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন আমিনুল। প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী তার জবানবন্দী গ্রহণ করেন। পরে তাকে জেরা করেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। তাকে সহায়তা করেন এডভোকেট তাজুল ইসলাম, এডভোকেট মনজুর আহমেদ আনসারী, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, আসাদ উদ্দিন, তারিকুল ইসলাম প্রমুখ।
সাক্ষী আমিনুল ইসলামের জবানবন্দী নিম্নরূপ:
আমার নাম মোঃ আমিনুল ইসলাম ডাব্লু, আমার বয়স- ৪৫/৪৬ বছর, আমার ঠিকানা- সাং বৃশিলাখা, থানা- বেড়া, জেলা- পাবনা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল আনুমানিক ৩ বছর। আমরা মোট ৯ ভাই-বোন, তার মধ্যে ৪ ভাই, ৫ বোন। ভাইদের মধ্যে সবার বড় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সেলিম লতিফ। আমি বড় হয়ে জানতে পারি যে, আমার আব্বা শহীদ সোহরাব উদ্দিন প্রামাণিক এবং বড় ভাই মোঃ আব্দুস সেলিম লতিফ মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে আমার আব্বা পাটের ব্যবসা করতেন এবং বড় ভাই আব্দুস সেলিম লতিফ বেড়া কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। আমার বড় ভাই আব্দুস সেলিম লতিফ ১৯৭১ সালের ১৫ ই আগস্ট বেড়া থানায় রেকি করতে যাওয়ার সময় বেড়া লঞ্চ ঘাটের নিকট রাজাকার, আলবদরদের হাতে ধরা পড়ে। আমার বড় ভাইয়ের সংগে ছিল চাচাতো ভাই আলাউদ্দিন। উল্লেখিত দু’জনকেই সেখান থেকে নগরবাড়ি ঘাটে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার বড় ভাই আব্দুস সেলিম লতিফের নিকট থেকে জানতে পারি নগরবাড়ি ঘাটে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর আমার উক্ত ভাই সেখানে জামায়াতের নেতা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে পাকিস্তানী আর্মিদের সাথে আলাপরত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর আমার ভাইকে পাকিস্তানী মিলিটারি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তার পিঠে জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনের ছ্যাকা দেয় যার ফলে তার পিঠে ক্ষত চিহ্ন হয় যা ভাইয়ের পিঠে এখনও আছে। এরপর আমার বড় ভাই ও চাচাতো ভাইকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে নগরবাড়ি ঘাটে ফেরির মধ্যে আটক রাখা হয়। তারপর আমার চাচাতো ভাই আলাউদ্দিনকে আমার ভাইয়ের নিকট থেকে অন্যত্র নিয়ে যায়। এর ১৫/২০ মিনিট পর আমার বড় ভাইকেও হাত পা বেঁধে        নগরবাড়ি ঘাটে নদীতে ফেলে দেয়। ভাগ্যক্রমে আমার বড় ভাই আব্দুস সেলিম লতিফ বেঁচে যান এবং একদিন পরে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। আমার চাচাতো ভাই ২/৩ দিন পর বাড়িতে ফিরে আসে।
আমার বড় ভাই এবং চাচাতো ভাই ফিরে আসার ১০/১৫ দিন পর আমার আব্বাসহ আমার উক্ত বড় ভাই ও চাচাতো ভাই এবং আরও কয়েকজন মাইনকার চর হয়ে ইন্ডিয়া চলে যায়। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকদিন পর আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আমার বড় ভাই ফিরে আসলেও আমার আব্বা সাবেক তথ্য মন্ত্রী ও তৎকালীন এমএনএ অধ্যাপক আবু সাঈদ সাহেবের সাথে ভারতে থেকে যান। ১৯৭১ সালের ২রা ডিসেম্বর আমার আব্বা ভারত থেকে আমাদের বাড়িতে ফিরে আসেন। আমার আব্বার ফিরে আসার খবর স্থানীয় আলবদর, রাজাকাররা জেনে যায় এবং মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের নিকট খবর জানায়। ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১ ভোর বেলা আলবদর, রাজাকার এবং পাকিস্তানী আর্মিরা আমাদের বৃশালিকা গ্রাম ফিরে এলে আমার আব্বাকে আমাদের বাড়ি থেকে ধরে রাস্তায় নিয়ে চরম নির্যাতন করে গুলী করে হত্যা করে। এছাড়া আমাদের গ্রামের মনু, ষষ্ঠি, ভাদু, জ্ঞানেন্দ্র নাথ হালদারসহ অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এবং গ্রামের ৭০/৭৫টি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। উল্লেখিত ঘটনা আমি আমার আম্মা, ভাই-বোন ও প্রতিবেশীদের নিকট থেকে জানতে পেরেছি। মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে আমি চিনি, তিনি অদ্য ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত আছেন (সনাক্তকৃত)। আমি অত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট জবানবন্দী প্রদান করেছি।
জেরার বিবরণ :
প্রশ্ন : আপনি বর্তমানে বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু সাহেবের বাড়ি আপনাদের গ্রামে।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : উনারা দু’জনই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে যান। এ সম্পর্কে আপনার কোন জ্ঞান আছে?
উত্তর : ভারতে গিয়েছিলেন শুনেছি। তবে কোন সময় যান তা জানি না।
প্রশ্ন : আপনার বাড়ি থেকে আবু সাইয়িদের বাড়ি কত দূর?
উত্তর : আনুমানিক ৪/৫শ’ মিটার।
প্রশ্ন : উনার বাড়ি তো পাকিস্তান আর্মিরা পুড়িয়ে দেয়।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : আপনার আব্বা অস্ত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন?
উত্তর : আমার জানা মতে, বেড়া থানা থেকে এবং অন্যান্য যাদের লাইসেন্স করা  অস্ত্র ছিল তা সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন বলে শুনেছি।
প্রশ্ন : যে রাজাকার ও আলবদররা আপনার ভাই ও চাচাতো ভাইকে আটক করেছিল তাদের নাম আপনার ভাই বলেছিলেন আপনাকে?
উত্তর : বলেছিল।
প্রশ্ন : সেই রাজাকাররা এখনো স্থানীয় এলাকায় বসবাস করেন।
উত্তর : অনেকে মারা গেছে। কেউ কেউ এখনো জীবিত আছে এবং বসবাস করছে।
প্রশ্ন : আপনি এটা শুনেছিলেন যে, আপনার ভাই সেলিম লতিফ ও আলাউদ্দিনকে যারা আটক করেছিল তাদের অনেকেই বিজয় অর্জনের পর আটক করা হয়েছিল।
উত্তর : আমি জানি না।
প্রশ্ন : আপনাদের এলাকায় বিজয় অর্জনের পর কোন রাজাকার আলবদরকে আটক করা হয়েছিল কি না?
উত্তর : আমি জানি না।
প্রশ্ন : সুরাইয়া সোহরাব, স্বামী ফজলুল বারী শাহীন, গ্রাম-ডাক বাংলাকে চেনেন?
উত্তর : জি, আমার ছোট বোন।
প্রশ্ন : আপনি কোন সালে ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হন?
উত্তর : ১৯৭৫/৭৬ সালে।
প্রশ্ন : আপনি এসএসসি কত সালে পাস করেন।
উত্তর : ১৯৮৬ সালে।
প্রশ্ন : আপনার এসএসসি রেজিস্ট্রেশন কার্ডের জন্ম তারিখ আপনি নিজে লিখেছেন।
উত্তর : কেরানী পূরণ করেছিল। আমি সই করি।
প্রশ্ন : জাতীয় পরিচয়পত্র আপনার দেয়া তথ্য মতে, আপনার স্বাক্ষরে দেয়া হয়। সেখানে আপনার জন্ম তারিখ ১/৯/১৯৭১ লেখা আছে।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : সকলের জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রত্যেকের জন্ম তারিখ লেখা আছে।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : আপনার ভাইয়ের নাম সম্বলিত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা দেখেছেন।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : তাতে আপনার পিতার নাম শহীদ হিসেবে উল্লেখ নেই।
উত্তর : আমি জানি না।
প্রশ্ন : আপনার দাদার নাম কি?
উত্তর : নয়ন।
প্রশ্ন : আপনাদের গ্রামে আপনার আব্বা ছাড়া সোহরাব আলী প্রামাণিক নামে অন্য কোন মুক্তিযোদ্ধা ছিল?
উত্তর : জানা নেই।
প্রশ্ন : আপনার আব্বা প্রামাণিক পদবী  সচরাচর ব্যবহার করতেন না।
উত্তর : মাঝে মাঝে ব্যবহার করতেন।
প্রশ্ন : আপনার ছোট বোন নাজমা আক্তার আপনাদের বাড়িতে একই অন্নে বসবাস করেন।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : আপনি যেদিন জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য তথ্য দেন আপনার বড় ভাই ও একই দিন তথ্য দেন।
উত্তর : ৩ দিনে হয়েছিল। বিভিন্ন জন বিভিন্ন সময়ে তথ্য দেন।
প্রশ্ন : আপনার বোন নাজমা আক্তার বেলী ১৫/১২/১৯৭৩ জন্ম তারিখ হিসেবে তথ্য দিয়েছিলেন।
উত্তর : জানা নেই।
প্রশ্ন : তিনি আপনার পরে এসএসসি পাস করেন।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : সুরাইয়া সোহরাব, নাজমা আক্তার বেলীর পরে এসএসসি পাস করেন।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : সুরাইয়া সোহরাবের জন্ম তারিখ জাতীয় পরিচয়পত্রে ৩১/১২/১৯৭৬ লেখা আছে।
উত্তর : আমি জানি না।
প্রশ্ন : সুরাইয়া সোহরাবের বিয়ের দিন আপনি বাড়িতেই ছিলেন।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : বিয়ের কাবিননামায় জন্ম তারিখ কত লেখা হয়?
উত্তর : জানি না।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনার পিতা শহীদ হননি।
উত্তর :  ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার ভাই নগরবাড়ি ঘাটে পাকিস্তান আর্মির সাথে মতিউর রহমান নিজামীকে আলাপ করতে দেখেছেন এ কথা সত্য নয়।
উত্তর : আমি ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ২রা ডিসেম্বর আপনার পিতার ফিরে আসার কথা স্থানীয় রাজাকার-আল বদররা মতিউর রহমান নিজামীর কাছে পৌঁছে দেয়। এই বক্তব্য অসত্য।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর আপনাদের গ্রামের রাস্তার সামনে আপনার পিতাকে নির্যাতন করে গুলী করে হত্যা এবং আপনাদের গ্রামের ৭০/৭৫টি বাড়ি আর্মিরা জ্বালিয়ে দেয় মর্মে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অসত্য।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার বয়স ৪৫/৪৬ বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটাও সত্য নয়।
উত্তর : সত্য।
প্রশ্ন : আপনার ছোট দুই বোনের জন্ম ১৯৭১ সালের পরে।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা হওয়ার কারণে আপনার দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের পরামর্শ ও নির্দেশে মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন।
উত্তর : ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার ছোট বোন নাজমা আক্তার বেলীর জন্ম ১৯৭১ সালের পরে।
উত্তর : সত্য।
প্রশ্ন : আপনার বোন সুরাইয়ার জন্ম ১৯৭৬ সালে।
উত্তর : সত্য নয়।
 
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=122981