২৪ মে ২০২০, রবিবার, ৩:৪২

ভেসে উঠতে শুরু করেছে ‘ক্ষতচিহ্ন’

উপকূলে ফল-ফসল বলতে কিছু নেই

আম্ফানের আঘাত

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান চলে যাওয়ার পর একে একে সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কারো ঘর ভেঙেছে, কারো নষ্ট হয়েছে ফসল, কারো আবার চিংড়ির ঘের ভেসে গেছে পানির তীব্র স্রোতে। আম্ফানের কারণে কপাল পুড়েছে অনেক আম ও লিচু চাষির। কোথাও বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। কালের কণ্ঠ’র আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিদের খবরে বিস্তারিত—

যশোর : সিডর, ফণী, বুলবুলের চেয়েও যশোরে বেশি ক্ষতি হয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফসলের। সবজি, আম, লিচু, পানসহ মোট ৩২ হাজার ৫১৬ হেক্টর জমির ফল ও ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কৃষি বিভাগের হিসাবে এ তথ্য জানানো হলেও ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর জমির পাট, ১১ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমির সবজি, ৬০০ হেক্টর জমির পেঁপে, এক হাজার ১২৫ হেক্টর জমির কলা, ৪০৫ হেক্টর জমির মরিচ, ৭৩২ হেক্টর জমির মুগ ডাল, দুই হাজার ১০৮ হেক্টর জমির তিল, ৪৪ হেক্টর জমির ভুট্টা, ৪৮০ হেক্টর জমির লিচু ও ৭৭৫ হেক্টর জমির পান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাতক্ষীরা : জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ২২ হাজার ৭১৫টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ৬১ হাজার ঘরবাড়ি। কৃষি বিভাগে ক্ষতির পরিমাণ ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মৎস্য বিভাগে ক্ষতির পরিমাণ ১৭৬ কোটি তিন লাখ টাকা। প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৮১ কিলোমিটার সড়ক ও ৫৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

রাজবাড়ী : জেলা কৃ?ষি সম্প্রসারণ অ?ধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ী?তে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর আবাদি কৃ?ষিজ?মি রয়ে?ছে। এর মধ্যে আম্ফা?নের প্রভাবে তিন হাজার ৮৬৭ হেক্টর কৃ?ষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের ম?ধ্যে রয়েছে ২৭৫ হেক্টর জমির বোরো ধান, দুই হাজার ৮৪০ হেক্টর জমির পাট, ২১২ হেক্টর জমির শাকসবজি, ২৪০ হেক্টর জমির তিল এবং ১০০ হেক্টর জমির মরিচসহ আরো ২০০ হেক্টর জমির ফসলা?দি।

আলমডাঙ্গা : চুয়াডাঙ্গার এই উপজেলায় বসতবাড়ি, গাছপালা, ফসল ও মৌসুমি ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় থেকে বিদ্যুৎ ছিল না প্রায় ৩৩ ঘণ্টা। সড়কের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। গাছের অধিকাংশ আম ও লিচু ঝরে পড়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, এক হাজার ৬০০ বসতবাড়ি, ২১০ হেক্টর বোরো ধানের ক্ষেত, ৬৯০ হেক্টর পানবরজ ও কলাক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০৭ হেক্টর।

আমতলী : বরগুনার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমতলী ও তালতলী উপজেলা। এর মধ্যে আমতলীতে এক হাজার ৮৯৩টি ঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক হাজারের বেশি মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে গেছে জোয়ারের পানিতে। দুই উপজেলার পাঁচটি স্থানে বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শতাধিক পরিবার। নষ্ট হয়েছে কয়েক হাজার একর জমির ফসল। উপড়ে পড়েছে হাজারো গাছপালা। দুটি উপজেলায় ৩৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।

ধুনট : বগুড়ার এই উপজেলায় কাঁচা ঘরবাড়ির পাশাপাশি লিচু, আম ও কাঁঠালের মতো মৌসুমি ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে সবজিক্ষেতের। মাড়াই প্রক্রিয়া শেষের দিকে থাকলেও কিছু জমির ভুট্টাগাছ হেলে মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আলিম বলেন, কৃষি খাতে বিভিন্ন ফসলের কমপক্ষে ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

ইন্দুরকানী : পিরোজপুরের এই উপজেলায় অতিরিক্ত পানির স্রোতে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বেড়িবাঁধের। কচা ও বলেশ্বর নদের পানি ঢুকে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে ১২টি গ্রাম। তলিয়ে গেছে মাছের ঘের ও ফসলি জমি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মাদ আল মুজাহিদ জানান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।

কুড়িগ্রাম : আম্ফানের আঘাতে বোরো ধান, ভুট্টা ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বেশ কিছু ঘরবাড়িও বিধ্বস্ত হয়েছে। বাড়ছে নদ-নদীর পানিও। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বাগেরহাট : এখনো এক হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। নদীপারের বাঁধ ভেঙে তিনটি উপজেলার আটটি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদুজ্জামান জানান, শরণখোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩০০ মিটার বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ, মোল্লাহাট ও চিতলমারীতে নদী পারে আট কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এসব বাঁধ দ্রুত সংস্কারের চেষ্টা চলছে।

রামপাল : বাগেরহাটের এই উপজেলায় এক হাজার ১৭৫টি পুকুর ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তলিয়ে গেছে অনেক ফসলি জমিও। এ ছাড়া পশুর নদী ও মোংলা ঘষিয়াখালি নৌ চ্যানেলসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পানির উচ্চতা বেড়ে গেছে।

পার্বতীপুর : উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় জানিয়েছে, ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার মধ্যে মাত্র দুটি ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতির আংশিক তথ্য পাওয়া গেছে। ২ নম্বর মনমথপুর ইউনিয়নের ১২ থেকে ১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

https://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2020/05/23/914948