৯ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১০:৩৪

যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্তির প্রশ্ন

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : রাজধানী ঢাকা নানামুখী সমস্যায় নাগরিকদের জীবনযাত্রা ক্রমেই দুর্ভোগময় হয়ে উঠছে। যানজট সবচেয়ে প্রকট ও জটিল আকারে ধারন করলেও প্রতিকারের ব্যবস্থা হতাশাজনক। এ নিয়ে বহু লেখালেখি ও নানা রকমের উদ্যোগের কথা শুনা গেলেও সমস্যার সুরাহা হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত যানজটের তীব্রতা বাড়ছে। যানজট নিয়ে সবারই কম বেশি মাথা ব্যাথা করে। কারও কারও রাতে ভালো ঘুমই হয় না টেনশনে। কোন কারণে যদি একটু দেরি হয়ে যায় তাহলে অফিসের সময় চলে যায়। আর বসের বকা শুনতে শুনতে সারাদিন এমনিতে মাটি হয়ে যায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও যানজট নেই,তা কিন্তু নয়! তবে ঢাকা শহরের মতো ভয়ানক পরিস্থিতি নয়। যানজট সুপারসনিক গতিতে বেড়ে চললেও পরিত্রানের গতি হচ্ছে কচ্ছপের মতো। যানজটকে ভালোবাসে এমন লোক সমাজ ও রাষ্ট্রে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমার কাছে বিষ আর যানজট একই মনে হয়। কারণ বিষ পান করলে তিলে তিলে কষ্টের যাতনায় যেমন মরতে হয়। তেমনি যানজটের কবলে পড়ে অসুস্থ রোগীকে কাতরাতে কাতরাতে রাস্তায়-ই মরতে হয়। তবে যারা বিএমডব্লিউ, ল্যান্ড রোভার,ল্যান্ড ক্রুজার মার্সিডিজির মতো নামি দামি এসি গাড়ীতে চড়ে তাদের কথা আলাদা। এই গরমের তাপে যেখানে আমরা শরীরের জামা খুলে ফেলে দিতে চায়, সেখানে তারা কোট প্যান্ট পড়ে আরামে বসে থাকেন। যানজটের ভিতরে গণ পরিবহনে যারা যাতায়াত করেন তারা বুঝে যানজট কী জিনিস। তাদের শরীরে ঘাম ঝরতে ঝরতে কাপড়চোপর ভিজে পায়ের কাছে নেমে আসে।  

যানজট নগরবাসীর জন্য এক বিড়ম্বনার নাম। প্রতিদিন মহাসড়কগুলোতে মহাজট লেগেই আছে। দেশের অগ্রগতিকে ভয়াবহ যানজট থামিয়ে দিচ্ছে। যানজটের কারণে যে সময় নষ্ট হচ্ছে তা অর্থনীতির বিচারে খুবই ভয়াবহ। রাষ্ট্র কোনভাবে এ দায় এড়াতে পারে না। যানজট শুধু অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, দেশের রপ্তানি-বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের রাজধানীকে যন্ত্রনার দৃষ্টিতে দেখছে এবং বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। নাম্বিও নামের একটি গ্লোবাল ডেটাবেইসের সমীক্ষায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে বিশে^র সর্বাধিক যানজটের শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই বছর আগে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়, ২০১৬ সালে ছিল তৃতীয়। সূচকের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাকে টপকে গেছে রাজধানী ঢাকা। কোন সরকারই যানজটের অসহনীয় যন্ত্রনা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে রাজধানীবাসীর নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে ভাগ করে। কিন্তু সরকার যে প্রত্যাশা নিয়ে ডিসিসি ভাগ করেছিল তার সুফল জনগণ পায়নি। ডিসিসি ভাগ করা হলেও নাগরিক সুবিধা ন্যূনতম বৃদ্ধি পায়নি। বরং দিন দিন নাগরিক সেবার মান তলানীতে। অথচ এ ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা হতাশাজনক।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাষ্যমতে,গত বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৬০। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। আর ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৪। বাস আছে ৩৯ হাজার ৭৮২। গত পাঁচ মাসে সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিমাসে প্রায় দেড় হাজার শুধু ব্যক্তিগত গাড়িই নিবন্ধিত হচ্ছে। তাছাড়া নিবন্ধিত নয় ভুয়া নিবন্ধনপত্রে কত যানবাহন চলাচল করছে তার হিসেবে কারও কাছে নেই। ঢাকা শহরের মোট সড়কের প্রায় ৫০ শতাংশজুড়েই চলাচল করে ব্যক্তিগত গাড়ি। অথচ এগুলো বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। অথচ ৫০ শতাংশ বড় বাসে প্রায় ৮৮ শতাংশ যাত্রী বহন করা সম্ভব। ওইসব কারণে যানজটে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে,বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এত উন্নয়নের স্লোগান চারদিকে মুখরিত হচ্ছে তবু নগরবাসী যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।

ঢাকা শহরের যানজটের মাত্রা কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে তা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবির) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়,বর্তমানে ঢাকায় যানজটে বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আর্থিক হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। যানজটের ক্ষতি পরিমাপে সময় ও জ¦ালানি তেলের অপচয়, জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ও শহরমুখী প্রবণতার বৃদ্ধিকে বিবেচনা করেছে এডিবি। যানজটে ব্রিটেনে জিডিপির ক্ষতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ফ্রান্সের ক্ষতি জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ, জার্মানিতে দশমিক ৯ ও যুক্তরাষ্ট্রে দশমিক ৬ শতাংশ। শুধু রাজধানী ঢাকা শহরে যানজটে ক্ষতি জিডিপির ৩ শতাংশ। যদিও এ ক্ষতি প্রকৃত অবস্থার চেয়ে অনেক কম বলে মনে করছে এডিবি। বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে বলা হয় গত ১০ বছরে ঢাকায় যান চলাচলের গড় গতি ঘন্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, একজন মুমূর্ষ রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে যথাসময়ে হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে রোগী নিয়ে একমুুহুর্ত বিলম্ব করার সুযোগ নেই, সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টার অ্যাম্বুলেন্সকে সুপারির গাছের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এ দৃশ্য পৃথিবীর অন্য কোন দেশে দেখা না গেলেও উন্নয়নের জোয়ারে ভাসমান দেশে ঠিকই দেখা যাচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, শুধুমাত্র রাজধানীতে যানজটের কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা ও জ্বালানি বাবদ অপচয় হয় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় অগ্রগতির পথে বড় প্রতিবন্ধক হচ্ছে যানজট। এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠার স্বপ্ন বর্ষার বাদলে ডুবে যাবে। তবে যানজটের পেছনে যতগুলো কারণ নিহিত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভিআইপিদের গাড়ি চলাচলে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি। ভিআইপিদের অগ্রাধিকার শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা প্রয়োজন। দেশের জাতীয় স্বার্থে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। যানজট নিরসনে একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণের বদলে ট্রাফিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বেশি নজর দিতে হবে।

এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে রাজধানীজুড়ে ফ্লাইওভারের জাল বুনলেও কোন কাজ হবে না। এটা ঠিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত ও যানজট কমানোর উদ্দেশ্যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ দেখা গেছে ফ্লাইওভারের কারণে এক জায়গায় যানজট কমলেও অপর জায়গাতে ঠিকই যানজটের জটলা। ইহা ছাড়াও আরো কিছু কারণ হচ্ছে চালকদের যাচ্ছেতাই আচরণ, ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানো,যেখানে সেখানে গাড়ি পাকিং,ছোট তথা ব্যক্তিগত গাড়ি, এলোপাতাড়ি রিক্সার চলাচল। যতগুলো রিক্সার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রিক্সা রাস্তায় চলাচল করছে। অনুমোদিত ৮০ হাজার পরিবর্তে কয়েক লাখ রিক্সা রাস্তায় চলাচল করছে। বিশে^র অন্য কোনো দেশে এমনভাবে দ্রুতযান ও ধীরগতির যান চলাচলের দৃশ্য দেখা যায় না। অথচ বাংলাদেশে ঠিকই দেখা যায়।

পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত নগরীর দুর্নাম ঢাকার হলেও স্রোতের মতো মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিদিন আড়াই-তিন হাজার মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। সরকারি হিসেবে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ঢাকায় বসবাস করে। রাজধানীর ফুটপাত ও বস্তিতে ছিন্নমূল যে সব মানুষ বসবাস করে তাদের সংখ্যাটা যোগ করলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। এভাবে যদি ঢাকায় মানুষ প্রবেশ করে তাহলে ঢাকার জনসংখ্যা তিন-চার কোটিও হতে পারে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ঢাকা নগরীতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় তিন হাজার লোক বসবাস করে। এমন ঘন বসতিপূর্ণ শহর বাটি চালান দিয়ে বাইরের দেশগুলোতে খুঁেজ পাওয়া দুষ্কর। একটি বাসযোগ্য নগরীর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা তো সরকারের দায়িত্ব। সরকার এ দায় অস্বীকার করতে পারবে না। নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থাকলেও নগরবাসী ন্যূনতম সেবাটুকু পাচ্ছে না। এ বিষয়টি রাষ্ট্রের ভেবে দেখা উচিত। বিশেষ করে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ফরয হয়ে গেছে। অথচ কোন সরকারই তা আমলে নিচ্ছে না। চিকিৎসা, শিক্ষা আর চাকুরি সবই ঢাকায় কেন?

ঢাকার বাহিরের জেলাগুলোকে উন্নত করতে পারলে ঢাকামুখী প্রবনতা অনেকটাই কমে যাবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ব্যতিত প্রশাসনকে ডিসেনট্রালাইজেশন যেমন করা সম্ভব না তেমনি ভোগান্তির যানজট থেকেও নগরবাসীকে মুক্তি দেয়া সম্ভব না। ঢাকার যতটুকু সড়ক পথ আছে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে যানজট ৮০ শতাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের বড় বড় শহরের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। হজের সময় মক্কা মদীনার লাখো লোকের সমাগম হয়। অথচ সেখানে যানজটে ঘন্টার পর ঘন্টা কেউ আটকে থেকেছে এমন কথা আমরা শুনিনি। তারা যদি ৫০ লাখ লোকের সমাগমকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না ঢাকাকে যানযটমুক্ত করতে। এটা বোধগম্য নয়। ফিলিপাইনে একসময় তীব্র যানজট ছিল। দেশটির জনগণের স্বাভাবিক চলাচল ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। এখন সেখানকার ট্রাফিক ব্যবস্থা বেশ উন্নত।

ফিলিপাইনের মতো দেশ আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বলেই তারা যানজট দূর করতে পেরেছে। নিয়ম শৃঙ্খলা না থাকলে শহর যতই পরিপাটি হোক না কেন সেখানে অরাজকতা থাকবেই। নিয়ম শঙ্খলা থাকলে যানজট দূর হতে বাধ্য তার উদাহারণ তো রাজধানীর ক্যান্টমেন্ট। ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরে যতগুলো পথ জনসাধারণের চলাচলের জন্য রয়েছে সে পথে বাস ড্রাইভার ইচ্ছে করলেই স্টপিজ ব্যতীত গাড়ি থামিয়ে লোক ওঠাতে পারে না। যদি কোন ড্রাইভার নির্দিষ্ট এরিয়া ব্যতীত যাত্রী উঠানামা করে তাহলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। আমার পরিচিত নাজমুল ইসলাম ক্যান্টমেন্ট দিয়ে প্রতিদিন আসাদগেইটে অফিস করেন, তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, ক্যান্টমেন্টের ভিতরে যেভাবে নিয়ম মানতে ড্রাইভারদেরকে বাধ্য করা হয়, সেভাবে যদি রাজধানীর সকল পথে নিয়ম মানতে সবাইকে বাধ্য করা যেত তাহলে যানজটের অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়া কিছুটা হলেও সম্ভব হত। সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে যানজটের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্টমহল এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে এমনটি দেশবাসীর প্রত্যাশা।

http://www.dailysangram.com/post/374868