২৩ মে ২০১৭, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
সাদা পোশাকে গ্রেফতার আতঙ্ক
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্ক নিয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী। কারাবন্দী, জামিনে মুক্ত ও ফেরারি নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হচ্ছে। নিঃশব্দে গ্রেফতার চলছে। দেশজুড়েই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভীতি। গত দুই মাসে এর মাত্রা বেড়েছে। যোগ হয়েছে সাদা পোশাক আতঙ্ক। রাত-বিরাতে সাদা পোশাকে বিরোধী নেতাদের তুলে নিয়ে সুবিধাজনক সময়ে পুরনো বা নতুন মামলা কিংবা মাদকদ্রব্যসহ গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। একই সাথে দিবানিশি রাজনীতিকদের বাসা-বাড়ি ও বাণিজ্যালয়ে চালানো হচ্ছে তল্লাশি। 
এদিকে এক মামলায় জামিন মিললেও বাতিল হচ্ছে একাধিক মামলার জামিন। আবার জামিনে মুক্তি পেয়েও স্বস্তি নেই। সহায় সম্পদ বিক্রি করে হলেও মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হচ্ছে। যাতে গুম, নতুন মামলার আসামি কিংবা পুরনো মামলার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়। 
গত ৫ বছরে বিএনপি ও তাদের মিত্র রাজনৈতিক দলের ৫ শতাধিক নেতাকর্মী নিখোঁজ। একেক নেতার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা ঝুলছে। গুম, জেল-জুলুমের দুশ্চিন্তায় হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও মৃত্যুর নজিরও রয়েছে। 
ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল হাকিমকে গত মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৪টায় সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেলযোগে তার নিজ বাসা (ঠাকুরগাঁও হাজিপাড়া) থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক থানা পুলিশে যোগাযোগ করা হলে কোনো হদিস দিতে পারেনি। বিষয়টি জানা নেই বলে হাকিমের স্বজনদের কাছে মন্তব্য করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় হাকিমকে ১/৫১ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। 
বিবৃতিতে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে গিয়ে অদৃশ্য করে দেয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই অদৃশ্য করাকে সরকার তাদের দুঃশাসনের অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে। এসব ঘটনা দেশের মানুষকে প্রতিদিন তীব্র থেকে তীব্রতর শঙ্কিত ও নিরাপত্তাহীন করে তুলছে। সারাদেশের মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভীতি ও আশঙ্কার মধ্যে বসবাস করছে।
৫৪ ধারা এবং সাদা পোশাকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে গত বছরের ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে সাদা পোশাকে গ্রেফতারের বেলায় অবশ্যই পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। সাথে গ্রেফতারি পরোয়ানাও থাকতে হবে। তুলে নেয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকটজনকে অবহিত করতে হবে। আসামির মৌলিক ও মানবাধিকার সংরক্ষণসহ গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশনাও দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। 
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী মিথ্যা মামলায় হয়রানি হচ্ছে। প্রতিদিন হাজিরা দিতে হচ্ছে, আবার জেলে যেতে হচ্ছে। যাতে গ্রেফতার না হতে হয় কিংবা মামলার চার্জশিটে নাম না থাকে সেজন্য জমিজমা বিক্রি করে টাকা দিতে হচ্ছে।
নজরুল ইসলাম খানের দাবি, বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেকে হঠাৎ স্টোক বা হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছেন। নেতাকর্মীরা এই যে গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, হয়রানির শিকার হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে যেতে পারছে না, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছে না, এমনকি আমাদের তরুণ ছেলে-মেয়েরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে নাÑ এই কষ্টগুলো যারা বিবেক দিয়ে যত বেশি অনুভব করছেন তারাই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। 
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহম্মেদ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মূলত তারা বিরোধী দলবিহীন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েম করতে চাচ্ছে। দেশ যে ভয়ঙ্কর দুঃসময় অতিক্রম করছে পোশাকে কিংবা সাদা পোশাকে গ্রেফতার, গুমের ঘটনা তার উদাহরণ। 
তুলে নেয়া বা গ্রেফতারে বাদ যাচ্ছে না অন্য শরিকরাও। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোর ৭টায় ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদীকে তার মানিকনগরের বাসা থেকে সাদা পোশাকধারীরা গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে গ্রেফতার করে। পরদিন নাশকতার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। রিমান্ডেও পাঠানো হয়েছে। 
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, মুবারক হোসাইন ও মাওলানা আজিজুর রহমানকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার হাইওয়ে থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি খুলনা উত্তর সাংগঠনিক জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস এবং সহকারী সেক্রেটারি ও ফুলতলা উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান এ টি এম গাউসুল আজম হাদী ও ফুলতলা সদর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি আব্দুস সাত্তার গাজীকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী মেডিক্রাল কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি সুমনসহ ২ ছাত্রশিবির কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে ওই ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মাহবুবুর রহমান রানাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ফেনী ও নারায়ণগঞ্জ ছাত্রদলের দুই নেতা দিদারুল আলম ও দর্পন প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়। একই রাতে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের বংশালের বাসা তল্লাশি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। 
আগের দিন ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের চকবাজার থানা ছাত্রদলের সভাপতি নুরুল আলম শিপুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি জামিন বাতিল করে জেলে পাঠানো হয়েছে সিলেট জেলা ছাত্রদল নেতা জুয়েল মাহমুদ, সালমান আহম্মেদকে। গতকাল ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: এছাক, ফুলগাজী উপজেলা ছাত্রদল নেতা আব্দুল কাদের জিলানী, কেফায়েত উল্ল্যাহ সুমন, যুবদল নেতা আবুল বাশার এবং শ্রমিক নেতা জিয়াউল হক আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। 
বিএনপির সহ: দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু ইনকিলাবকে বলেন, আজ পর্যন্ত কতজন গ্রেফতার হয়েছে তা বলা মুশকিল। কারণ ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর আসছে বাসা-বাড়ি অথবা রাস্তা থেকে নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কোনোটি পোশাকী পুলিশ কোনোটি সাদা পোশাকের। সহ¯্রাধিক নেতার গ্রেফতার ও জামিন বাতিলের খবর রয়েছে তার কাছে। এই নেতা জানান, এই সময়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো সাদা পোশাক। কারণ ওই পোশাকে বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে নিয়ে আগে নাশকতার মামলায় চালান দিত। এখন গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাতে একদিকে চরিত্র হনন হচ্ছে অন্যদিকে এসব মামলার ফাইল ২-৩ মাসেও বিচারকের সামনে আসছে না। দ্রুত জামিনও হচ্ছে না।
তিনি জানান, সাদা পোশাকে তুলে নেয়ার পর এখন আর পরিবারের সদস্যরা তা প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। স্বজনকে মুক্ত করতে মোটা অঙ্কের দফারফার মাধ্যমে ২-৩ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ব্যর্থ হবার পর দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে জানায়। 
ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক সাত্তার পাটোয়ারীর দেয়া তথ্য মতে, ছাত্র দলের ৮ শতাধিক নেতাকর্মী কারাবন্দী। এর মধ্যে চলতি বছরেই ৫ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার এবং জামিন বাতিল করে জেলে প্রেরণ করা হয়েছে। বিএনপিসহ অন্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং ২০ দলীয় জোটের প্রায় ১ হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। 
২০ দলীয় জোটের শরিক লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ইনকিলাবকে বলেন, নেতাকর্মীরা তো গ্রেফতার হচ্ছেই। সপ্তাহে ৩-৪ বার গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ফোন করে বিভিন্ন তথ্য জানতে চায়। এটি আমাদের মানসিকভাবে দুর্বল রাখার অপকৌশল মাত্র।
গ্রেফতারের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/article/65979/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A7%8B%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AB%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%A4%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%95#sthash.YktNOMgf.dpuf