৭ এপ্রিল ২০১৬, বৃহস্পতিবার

আমীরে জামায়াত জনাব মকবুল আহমাদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত

তৃণমুল থেকে উঠে আসা দ্বীনের এক নিবেদিত প্রাণ জনাব মকবুল আহমাদ। এই মানুষটি এ দেশের জনগনের নিকট খুবই পরিচিত। ব্যক্তি জীবনে তিনি বিনয়ী, অল্পেতুষ্ট, পরপোকারী, স্বজ্জন ব্যক্তি, হিসেবেই তিনি সকলের হৃদয়ে আস্থার জায়গা করে নিয়েছেন আপন মহিমায়। নরমদিল, অমায়িক ব্যবহার, ও স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী, সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি কখনো কারো সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন কিংবা কাউকে সামান্য কোন কটু কথা বলে আঘাত দিয়েছেন এমন কোন নজির নেই। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানিকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃনা করেন। তিনি সত্যিই একজন সাদামনের মানুষ। যারা তাঁর সাথে মিশেছেন তারাই এর সাক্ষী। 

“বাসের ভেতরে সীট না পেয়েও যিনি বাসের ছাদে বসে সাংগঠনিক প্রোগ্রামের কারণে সফরে গিয়েছেন, সাংগঠনিক কাজ ও ব্যক্তিগত কাজ-এ দুটো যিনি চুলচেরা হিসাব নিকাশ করে প্রতিটি পা’ ফেলেন, সৎ কর্মই যার জীবনের লক্ষ্য, মুখে যা বলেন, বাস্তবেও তা করার চেষ্টা করেন, কথা ও কাজে যার মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যার জীবনের লক্ষ্যই হলো মানুষের কাছে দ্বীন কায়েমের দাওয়াত পৌঁছানো, একবার পরিচয় হলে যার নাম তিনি নোট করে রাখেন- ১০ বছর পর হলেও তাকে খুঁজে বের করেন, দ্বীনের দাওয়াত দেন, যার ডায়েরীতে লিখিতভাবে আছে দাওয়াত পৌঁছানোর সমস্ত ছোট বড় অনেকেরই তালিকা। দিল যার স্বচ্ছ-সুন্দর, যার জীবন এক সুন্দর নিয়মের ছকে বাঁধা, যিনি প্রতিনিয়তঃ মনে জাগরুক রাখার চেষ্টা করেন- আল্লাহ তাআলার এ বাণী- ‘লীমা তাকুলূনা মা লা- তাফ আলুন’- “এমন কথা কেন বল, যা তোমরা কার্যত করো না।”- সূরা সফ ঃ২
তিনিই হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নির্বাচিত আমীর এবং প্রথম কাতারের নেতাদের মধ্যে অন্যতম একজন জনাব মকবুল আহমাদ। 

জন্ম ও শিক্ষা:
ফেনী জিলার দাগনভূঁইয়া উপজেলাধীন ওমরাবাদে ১৯৩৯ সালের ২রা আগস্টে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পূর্বচন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দাগনভূঁইয়ার কামাল আতাতুর্ক হাইস্কুলে ভর্তি হন। অতপর তিনি ফেনি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেনীতে ভর্তি হন এবং ১৯৫৭ সালে কৃতিত্বের সাথে জায়লস্কর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে বি.এ. পাস করেন। 

কর্মজীবন:
জনাব মকবুল আহমদ বি.এ. পাস করার পর সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন। একবছর পর সরকারী চাকুরী ছেড়ে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন এবং ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সরিষাদী উচ্চবিদ্যালয় ও ফেনী স্ট্রোল হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ফেনী মহকুমাধীন ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সত্তর দশকের দিকে ‘বাংলাদেশের ব্লাকগোল্ড’ শিরোনামে বাংলাদেশের কক্সবাজারের চিংড়ি মাছের উৎপাদনের উপর তার লেখা একটি প্রতিবেদন ব্যবসায়ী জগতে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের ব্লাকগোল্ড’ (চিংড়ি সম্পদ) সৌদী আরবের ‘তরল সোনাকে (পেট্রোল)” হার মানাবে?

ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন
ছাত্র জীবন থেকেই মকবুল আহমদ ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছাত্র জীবন শেষ করেই ১৯৬২ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং ১৯৬৬ সালে রুকুনিয়াতের শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি ফেনী শহর আমীরের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মহকুমা আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ’৭০ সালের শেষ দিকে তিনি বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।  

১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচনে ফেনী সদর সোনাগাজী নির্বাচনী এলাকায় জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হিসাবে এবং ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী ২ এলাকা থেকে অংশ নেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর চট্টগ্রাম বিভাগে তিনি দ্বীনী দাওয়াতের কাজ করেন। অতপর জনাব মকবুল আহমদ ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

১৯৮৯ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অন্যতম সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৩ থেকে তিনি জামায়াতের অন্যতম নায়েবে আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১০ সালের ২৯ জুন থেকে ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি জামায়াতের নির্বাচিত আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। জনাব মকবুল আহমাদ জনগণের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যাপারে সদা জাগ্রত এবং বিরামহীন ব্যক্তিত্ব। তিনি নিরলস ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সাধারণ জনগণের কাছে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ করে চলেছেন।

সমাজ সেবা:
ছাত্র জীবন থেকেই তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজের সাথে জড়িত আছেন। তাঁর জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট হলো মানুষের সেবা করা। ১৯৬২ সালে যুবকদের সহযোগিতায় ওমরাবাদে (নিজ গ্রামে) “ওমরাবাদ পল্লীমঙ্গল সমিতি” নামে একটি সমিতি গঠন করেন। তিনি উক্ত সমিতির ১০ (দশ) বছর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি অনেক স্থানীয় রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামতের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং গরীব ও অসহায় লোকদেরকে সহযোগিতা প্রদান করেন।

১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি গজারিয়া হাফেজিয়া মাদরাসায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে গজারিয়া হাফেজিয়া মাদরাসায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বর্তমানে ফালাহ-ই-আম ট্রাস্ট, ঢাকা; সিলোনীয়া আঞ্জুমানে ফালাহীল মুসলেমীন ট্রাস্ট এবং ফেনী ইসলামিক সোসাইটি, দাগন ভূঁইয়া সিরাজুম মুনীরা সোসাইটির চেয়াম্যান, ২ বছর দৈনিক সংগ্রামের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বর্তমানে দৈনিক সংগ্রাম ট্রাস্টি বোর্ডের একজন ডাইরেক্টর। ফেনী ইসলামিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী “ফেনী শাহিন একাডেমীর” সভাপতি।

সুপরিচ্ছন্ন জীবনের অধিকারী জনাব মকবুল আহমদ সহজ ও সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। এ নশ্বর দুনিয়ায় তিনি আল্লাহর একজন খাঁটি দাস হিসেবে বসবাস করতে সদা সচেষ্ট। আখেরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি কিভাবে অর্জন করা যায় এটাই তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। নিঃসন্দেহে বর্তমান এবং অনাগতদের জন্য তিনি একজন অনুপ্রেরণার উৎস।

সাহিত্য কর্ম ও দেশভ্রমণ:
রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর মেহমান হিসাবে তিনি ২বার হজ্জ পালন করেন। তিনি জাপান ও কুয়েত (সাংগঠনিক প্রয়োজনে) সফর করেন। সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় “জাপান সফর- দেখার অনেক, শিখার অনেক” এ বিষয় তার সফর অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি সুন্দর লিখা প্রকাশিত হয়।

বৈবাহিক জীবন:
জনাব মকবুল আহমদ ১৯৬৬ সালে মুহতারেমা সুরাইয়া বেগমকে বিবাহ করেন। তাদের তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে। উল্লেখ্য, তার স্ত্রী একজন রুকন।